যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরুর আহ্বান জানাবে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল
মতবিনিময় সভায় মহাসচিব আইরিন খান
নিজস্ব প্রতিবেদক
১৯৭১ সালে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্তদের বিচার-প্রক্রিয়া শুরুর জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানাবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। একই সঙ্গে মানুষের মত প্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করা এবং মানবাধিকার কমিশন গঠন, পুলিশ বাহিনীর সংস্কার, বিচার বিভাগ শক্তিশালীকরণসহ মানবাধিকারের উন্নয়নে বিভিন্ন সুপারিশ সরকারের কাছে তুলে ধরবে অ্যামনেস্টি।
বাংলাদেশে গতকাল শনিবার থেকে পাঁচ দিনব্যাপী অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রথম প্রচারণামূলক অনুষ্ঠানের শুরুতে মতবিনিময়ের সময় সংগঠনের মহাসচিব আইরিন খান এসব কথা বলেন। বাংলাদেশে জরুরি আইন জারির এক বছর উপলক্ষে অ্যামনেস্টি এ কর্মসুচি চালাচ্ছে। এ সময় সরকারের কর্মকান্ড সম্পর্কে তারা একটি সুপারিশ প্রতিবেদন সরকারের হাতে তুলে দেবে।
গতকাল সকালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ের এলজিইডি ভবনে অনুষ্ঠিত "মানুষের আত্মমর্যাদা বিষয়ে প্রচারণা" শীর্ষক মতবিনিময় সভায় মাঠপর্যায়ে কর্মরত এনজিও ও উন্নয়ন কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত বিশেষজ্ঞদের মতামত গ্রহণ করে অ্যামনেস্টি। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা "মানুষের জন্য"র সহযোগিতায় এই মতবিনিময় সভা হয়।
মানুষের জন্যর নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনামের সভাপতিত্বে আলোচনায় দেশের মানবাধিকার পরিস্িথতি, সমস্যা ও সম্ভাবনা এবং করণীয় সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরে বক্তব্য রাখেন শাহরিয়ার কবির, ড. আইনুন নিশাত, ড. আতিউর রহমান, অধ্যাপক মাহমুদা ইসলাম, ড. মেঘনা গুহঠাকুরতা, শিপা হাফিজা, মেসবাহ কামাল, অ্যারোমা দত্ত, মোশাররফ হোসেন, রবিন সরেন, মিলন কুমার দাস, রঞ্জন কর্মকার প্রমুখ।
আইরিন খান বলেন, বাংলাদেশের সরকার বলছে, তারা নতুনভাবে দেশকে গড়ে তুলবে। তাদের এ কাজে অবশ্যই তারা আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা দেখাবে এবং মেনে চলবে, সেটা সবাই আশা করে।
সরকার ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের কথা বলছে উল্লেখ করে অ্যামনেস্টির মহাসচিব বলেন, এ লক্ষ্যে গত এক বছরে কতটা অগ্রগতি হয়েছে, নির্বাচনের আগে কতটা অগ্রগতি হবে, এবং গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এসে কীভাবে এই পরিবর্তন আনবে, তা নিয়ে বর্তমান সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করবেন তাঁরা। একই সঙ্গে মানবাধিকার পরিস্িথতির উন্নয়ন, মানবাধিকারকর্মীদের রক্ষা প্রভৃতি ক্ষেত্রে করণীয় সম্পর্কে গবেষণার জন্য মতামত নেবে অ্যামনেস্টি।
কারও প্রতি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না তুলে আইরিন খান বলেন, বাংলাদেশে তো বটেই, পাকিস্তান বা বিশ্বের অন্য কোনো দেশেও যদি একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীরা থাকেন, তাহলে তাঁর বিচার করা উচিত। ১৯৭১ সাল থেকে আজ পর্যন্ত যাঁরা অপরাধের জন্য দন্ডমুক্তি (ইম্পিউনিটি) উপভোগ করেছেন, তাঁদের সবাইকেই বিচারের সম্মুখীন করতে হবে।
আইরিন খান বলেন, জরুরি অবস্থার মধ্যেও মানুষের কী অধিকার থাকবে, তার সুনির্দিষ্ট রূপরেখা আন্তর্জাতিক আইনে আছে। এ আইন মেনে চলতে হবে। জরুরি আইনের সঙ্গে মানবাধিকার লঙ্ঘনের কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, জরুরি আইন চলার সময় মানবাধিকার পরিস্িথতি ভালো করা সম্ভব।
মহাসচিব বলেন, কথা বলার স্বাধীনতা থাকতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা ছাত্রদের পক্ষে কথা বলেছেন বলে তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। বিচার চলছে। এটা হতে পারে না। প্রত্যেকের কথা বলার, ভাব-প্রকাশের স্বাধীনতা থাকতে হবে। বিচারের ক্ষেত্রে বৈষম্য হচ্ছে কি না, সে বিষয়টিও সরকারের সামনে তুলে ধরা হবে। একই সময়ে কেউ রাস্তায় মিছিল করলে বিচারের সম্মুখীন করা হচ্ছে, আবার কাউকে কাউকে আটকও করা হচ্ছে না।
আইরিন খান বলেন, বিচারবহির্ভুত হত্যাকান্ডের বিচার, নির্যাতন, ভাব-প্রকাশের স্বাধীনতা রোধ প্রভৃতি বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সরকারের কাছে সুপারিশ তুলে ধরা হবে। সেনাসদস্য, র্যাব বা পুলিশ, কেউ যেন ছাড় না পায় তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
কারাগারে আটক দুই নেত্রীর জামিনের বিষয়ে সাংবাদিকেরা জানতে চাইলে আইরিন খান বলেন, শুধু রাজনৈতিক নেতা নয়, সব মানুষের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। সবাইকে সমান দৃষ্টিতে দেখতে হবে।
আইরিন খান বলেন, প্রথম আলোর কার্টুনিস্ট আরিফকে "বিবেক-বন্দী" হিসেবে গ্রহণ করেছে অ্যামনেস্টি। তার মুক্তির জন্যও অ্যামনেস্টি উদ্যোগ নেবে। সরকারের কাছেও তাঁরা বিষয়টি তুলে ধরবেন।
অ্যামনেস্টি মহাসচিবের উপদেষ্টা ডেভিড পেট্রাসেক বলেন, দারিদ্র্য দুর করে সাধারণ মানুষের পক্ষে বিচারের আশ্রয় লাভ সহজ করা মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য জরুরি।
ড. মেঘনা গুহঠাকুরতা ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সংখ্যালঘুদের প্রতি বৈষম্য দুর করার আহ্বান জানান।
ড. আইনুন নিশাত বলেন, কেউ ছুটি কাটাতে সুইজারল্যান্ড যাবেন, আর কেউ খাবারের জন্য বিডিআর মার্কেটে লাইন ধরে দাঁড়াবেন, তাহলে লাগসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।URL : http://www.prothom-alo.com/print.php?t=h&nid=MTMwNzQ=
সৌজন্যেঃ মুক্তমনা মুক্তিযুদ্ধ আর্কাইভ