৪ ডিসেম্বর ২০০৭৭১ জানুক পরের প্রজন্ম
জাহীদ রেজা নুরবিজয়ের মাস এসেছে।
আমাদের শিশুরা কি জানে, এই বিজয় কবে এসেছে, কীভাবে এসেছে, কাদের ত্যাগের বিনিময়ে এসেছে?
কখনো আমরা কি শিশু সন্তানের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কথা বলেছি?
শুধু ডিসেম্বরে নয়, মার্চে নয়, বছরের যেকোনো সময়ই তো মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কথা বলা যায়। বলা দরকার।
কারণ, মুক্তিযুদ্ধ হাজার বছরের বাঙালি-ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সবচেয়ে বীরত্বব্যঞ্জক ঘটনা।
১৯৭১ সাল তাই আর সবকিছুর চেয়ে বড়। ২৬ মার্চ ও ১৬ ডিসেম্বর তাই আর যেকোনো তারিখের চেয়ে অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ।
এই কথাগুলো কি আপনি বা আমি জানিয়েছি আমাদের শিশুকে?
একাত্তরে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী এবং তাদের এ দেশীয় দোসর রাজাকার-আলবদরদের হাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, এমন একটি পরিবার কি এদেশে খুঁজে পাওয়া যাবে? তাদের ব্যাপারে আপনার শিশু কতটা জানে?
‘লোকে ভুলে যেতে চায়, সহজেই ভোলে’−কবির এই পঙ্ক্তি কি একাত্তর সম্পর্কেও খাটবে?
কোনো জাতিই তাদের বিজয়কে, তাদের বীরত্বকে অবজ্ঞা-অবহেলা করে না।
আমাদেরও উচিত হবে না মুক্তিযুদ্ধকে অনেক দুরে ঠেলে দিতে। বিজয়ের অর্জনকে ভুলে যেতে দেওয়াও ঠিক হবে না।একাত্তরকে ‘অনেক দুরের ঘটনা’ বলে দায়িত্ব এড়ানোর প্রশ্নই ওঠে না।
কখনো কি খেয়াল করে দেখেছেন, শিশুটি ভুল দরজায় কড়া নাড়ছে কি না? যে শিশুকে ‘আগামী দিনের ভবিষ্যৎ’ বলে সার্টিফিকেট দিচ্ছি আমরা, তার ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে, তার মনে দেশপ্রেম জাগিয়ে তোলার জন্য কী করছি?
‘আগামী দিনের ভবিষ্যৎ’−এই প্রজন্ন যেন ইতিহাসবিস্নৃত হয়ে গড়ে না ওঠে, তা নিশ্চিত করা যায় কয়েকটি কাজের মাধ্যমে, এখনই।
এক নদী রক্ত পেরিয়ে
জন্নদিনে বা বিশেষ কোনো উপলক্ষে আপনার সন্তানকে, আপনার শিশুকে বই উপহার দিন। চমৎকার এই রেওয়াজটি ফিরিয়ে আনুন।
একটি ঘটনা: বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ দলিলপত্র-এর অষ্টম খন্ডটি পড়ছিলেন বাবা। এ খন্ডে রয়েছে একাত্তরে নির্যাতিত মানুষের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা। বাবা একটু সরেছেন টেবিল থেকে, সপ্তম শ্রেণীতে পড়ুয়া তাঁর মেয়েটি হঠাৎ সেখানে হাজির। খোলা বইটিতে চোখ রাখতেই ওর শরীর অবশ। কয়েক পাতা পড়তে গিয়েই চোখে জল। বাবা এসে দেখেন, বইটি আর নেই তাঁর টেবিলে; মেয়েটি নিয়ে গেছে। পড়ছে। মেয়েটিই একসময় বাবাকে অভিযোগ করে, মাত্র কয়েক বছর আগে ঘটে যাওয়া মুক্তিযুদ্ধের এই কাহিনীগুলো মা-বাবা কেন তাকে বলেননি।
এই মেয়েটি অন্য অনেক ছেলে বা মেয়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা মেয়ে। তাদের বাড়িতে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কথাবার্তা হয়, কিন্তু এই সচেতন পরিবারটিও পরবর্তী প্রজন্েনর হাতে তুলে দেয়নি একাত্তরের ইতিহাস−যদিও তাদের বাড়িতেই এ ইতিহাস-সম্পৃক্ত অসংখ্য বই রয়েছে।
হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ দলিলপত্র-এর সংকলনগুলো কেন থাকবে না আপনার বাড়িতে? কেন থাকবে না মেজর (অব.) রফিকুল ইসলামের লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে, মাহবুব আলমের গেরিলা যুদ্ধ থেকে সম্মুখসমরে, শহীদজননী জাহানারা ইমামের একাত্তরের দিনগুলি, রশীদ হায়দার সম্পাদিত স্নৃতি ’৭১ বা ১৯৭১: ভয়াবহ অভিজ্ঞতা!
উল্লেখযোগ্য প্রকাশনীর ক্যাটালগে খোঁজ করলেই পেয়ে যাবেন অনেক বই। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে স্নৃতিকথা, প্রবন্ধ, কবিতা, গল্প, উপন্যাস কম লেখা হয়নি। সে বইগুলো পড়ুক আপনার ছেলে বা মেয়ে। তার মনে প্রশ্ন জাগুক। সে প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার জন্য তৈরি হোক। এক নদী রক্ত পেরিয়ে যারা স্বাধীনতা আনল, তাদের সম্পর্কে আপনার শিশুটি জানুক আপনার মুখ থেকে, আপনার সংগ্রহের বই থেকে।
এই পদ্মা এই মেঘনা
কম্পিউটার খুলে বসলেই তো চোখের সামনে বিশাল পৃথিবী। ইন্টারনেটে ওয়েবসাইট দেখতে দেখতেই চলে যাওয়া যায় পছন্দমতো ঠিকানায়। কিংবা টেলিভিশনের রিমোটে হাত রাখলেই ইংরেজি, হিন্দির জগতে অনায়াস প্রবেশাধিকার। আরও অনেক ভাষা, অনেক ধরনের অনুষ্ঠান। শুধু চাই কম্পিউটার বা টেলিভিশনের সামনে বসে থাকার মতো সময় বা ইচ্ছা। ব্যস, মুশকিল আসান হয়ে তারাই এগিয়ে আসবে কান ও চোখের তৃষ্ণা মেটাতে। খাওয়ার সময়টাতেও পর্দার দিকে চোখ রাখা সম্ভব।
ইন্টারনেটে কী খোঁজে শিশু? কী দেখে সে টেলিভিশনে? এ বিষয়ে কি খোঁজ নিয়েছেন?
হিন্দি বা বাংলা সিরিয়ালগুলো, হলিউড-বলিউডে শিশুটির মাথা কি ভরে উঠছে? ডিভিডিতে কোন ছবি সে দেখছে? রোমান পোলানস্কির পিয়ানিস্ট ছবিটি দেখতে দিন। দেখতে দিন স্পিলবার্গের সেভিং প্রাইভেট রায়ান, ...লাইফ ইজ বিউটিফুল। এবার ওর সামনে রাখুন জীবন থেকে নেয়া, ওরা ১১ জন, আগুনের পরশমণি, আগামী, জয়যাত্রা। প্রামাণ্যচিত্রগুলো আরও বেশি সাহায্য করবে ওকে। স্টপ জেনোসাইড, নাইন মান্থস টু ফ্রিডম, মুক্তির গান দেখুক ওরা। ওরাই বুঝে নিক−কোনটা গ্রহণ করতে হবে, কোনটা নয়। ওরাই সিদ্ধান্ত নিক−মানবতার বিরুদ্ধে যারা অপরাধ করেছে, তাদের ক্ষমা করা উচিত, নাকি শাস্তি হওয়া উচিত। ওরা ন্যুরেমবার্গ সম্পর্কে জানুক, কসোভো গণহত্যা বিষয়ে ট্রাইব্যুনাল নিয়ে জানুক, তারপর বলুক−যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সাধারণ আদালতে, নাকি বিশেষ ট্রাইব্যুনালে করা উচিত।
চলো না ঘুরে আসি
আপনার শিশুটিকে নিয়ে রায়ের বাজার বুদ্ধিজীবী স্নৃতিসৌধে গেছেন কি কখনো? কিংবা সাভারের জাতীয় স্নৃতিসৌধে? দেশজুড়ে যে অসংখ্য বধ্যভুমি রয়েছে, সেগুলো কি দেখেছে আপনার সন্তান? শুনেছে কি চুকনগর (ডুমুরিয়া, খুলনা), গল্লামারী (খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়), ব্রাਜ਼ণবাড়িয়াসহ গণকবরগুলোর কথা? সারা দেশটাকেই যে বধ্যভুমি বানিয়েছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আর তাদের দোসর রাজাকার-আলবদররা, সন্তানকে সেটা স্পষ্টভাষায় জানিয়ে দিন। ওকে নিয়ে যান মুজিবনগরের আম্রকাননে, রেসকোর্সে (এখন সোহরাওয়ার্দী উদ্যান), ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কে বঙ্গবন্ধুর বাড়িটিতে (এখন বঙ্গবন্ধু জাদুঘর), বীরশ্রেষ্ঠদের সমাধিসৌধের কাছে। বলুন, এসব জায়গায় জন্ন নিয়েছে ইতিহাস।
গানের ভেতর দিয়ে
যে গানগুলো বাজত একাত্তরে, সেগুলোর সিডি কিংবা ক্যাসেট কি আপনার বাড়িতে আছে? কিংবা স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে লেখা অসাধারণ দেশাত্মবোধক গানগুলো কি আপনার সন্তান শোনে। ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাব বলে’, ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’, ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে’, ‘এক নদী রক্ত পেরিয়ে’, ‘সব কটা জানালা খুলে দাও না’ গানগুলো বিভিন্ন সময়ের; কিন্তু এর সবই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্ভাসিত। একটি তালিকা করে গানগুলো শুনতে দিন সন্তানকে। গানের কোনো কোনো শব্দ নিয়ে শিশুর প্রশ্ন থাকলে তার ব্যাখ্যা করুন।
অন্তর্জালে
কম্পিউটারের ইন্টারনেটও খুব কাজের। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক তথ্য জানার জন্য বেশ কিছু সাইটে ভ্রমণ করা সম্ভব। সেগুলো জেনে নিয়ে পড়ে ফেলা যেতে পারে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। সে রকমই কিছু ঠিকানা দেওয়া যায়। যেমন, www.liberationmuseum.org.bd, www.mukto-mona.com, www.nybangla.com কিংবা www.meltingpot.fortunecity.com ঠিকানায় গেলে পুরো একাত্তরে কী কী ঘটনা ঘটেছে, তার একটি তালিকা পাওয়া যাবে।
বলছি না, শিশুকে অতীত নিয়েই পড়ে থাকতে হবে। বলছি, অতীতকে জেনে তবেই যেন সে ভবিষ্যতের দিকে পা বাড়ায়। সেটা হলে প্রতিটি পদক্ষেপই হবে আত্মনির্ভর, গর্বিত পদক্ষেপ।
UURL: http://www.prothom-alo.com/archive/print.php?dt=2007-12-04&issue_id=448&t=f&nid=MTcxMDI=