বিজয় দিবস ২০০৭-�র বিশেষ রচনা
সৌজন�যেঃ

‘তখনই জানতাম, যা দেখছি বাকি জীবনে আর দেখব না’
ড. জিওফ�রে ডেভিস

১৯৭১ সালে পাকিস�তানি দখলদার ও তাদের � দেশীয় সহযোগীদের নির�যাতনের শিকার হন বাংলাদেশের লাখ লাখ নারী। সেই নির�যাতনের ফসল ‘য�দ�ধশিশ�’দের ওপর গবেষণা করতে গিয়ে অস�ট�রেলিয়া প�রবাসী বাংলাদেশি লেখক ও গবেষক ড. বীণা ডি’কস�টা অস�ট�রেলীয় চিকিৎসক ড. জিওফ�রে ডেভিসের খো�জ পান। ড. ডেভিস �কাত�তরে য�দ�ধবিধ�বস�ত বাংলাদেশে আসেন নির�যাতত নারীদের সহায়তা করার জন�য। থাকেন ১৯৭২ সালের মার�চ থেকে ছয় সপ�তাহ। ইন�টারন�যাশনাল প�ল�যান�ড ফাদারহ�ড, ইউ�ন�ফপি� �বং ডব�লিউ�ইচও তা�র পৃষ�ঠপোষকতা করলেও প�রথম দিকে কেউই দায়দায়িত�ব নিতে রাজি হয়নি।
শারীরিক ও মানসিকভাবে বিধ�বস�ত সেই সব সংগ�রামী নারীর প�নর�বাসন ছিল স�বাধীনতার পর রাষ�ট�রগঠন কাজের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ�যায়। ড. ডেভিস সেই কাজের �ক সহযোগী �বং সেই অধ�যায়ের �ক গ�র�ত�বপূর�ণ সাক�ষী। �খানে অস�ট�রেলিয়ান ন�যাশনাল ইউনিভার�সিটির ফ�যাকাল�টি অব �শিয়ান স�টাডিজের শিক�ষক ড. বীণা ডি’কস�টার পি�ইচডি গবেষণায় ড. ডেভিসের সাক�ষাৎকার অবলম�বনে বাংলাদেশের �ই বন�ধ�র অভিজ�ঞতা ত�লে দেওয়া হলো।

আটক অবস�থায় যে শিশ�রা জন�েনছিল, তাদের বা�চানোই ছিল আমার প�রথম কাজ। পাশাপাশি যারা গর�ভস�থ শিশ�দের রাখতে নারাজ, তাদের গর�ভপাতে রাজি করানোতেও আমি সচেষ�ট ছিলাম। যদিবা জন�নাত, মায়েদের অপ�ষ�টিসহ নানাবিধ কারণে সেসব শিশ� হতো র�গ�ণ ও অপ�ষ�ট। �টা না করে উপায়ও ছিল না। তাই আমরা সফল হয়েছিলাম। বাংলাদেশে যা-ই হয়, ব�যাপক সংখ�যায় হয়। তার পরও আমরা পাল�লা দিতে পেরেছি। কিন�ত� শিশ�দের পারিবারিক পরিবেশে প�রতিষ�ঠা করা ছিল সত�যিই কঠিন।
স�বেচ�ছায় কাজটি বেছে নেওয়ার পেছনে দায়িত�ববোধ তো ছিলই, তা ছাড়া আমি ৩০ সপ�তাহ বয়সী ভ�রূণের গর�ভপাতে বিশেষভাবে প�রশিক�ষণ নিয়েছিলাম। �খানে �সে কাজ শ�র� করি ধানমন�ডির �কটি ক�লিনিকে। � ছাড়া হাসপাতাল নেই �মন সব শহরেও কাজ করেছি। কিন�ত� মেয়েদের সংখ�যা �ত বেশি ছিল যে �কা সব পারতাম না। তাই নত�ন কর�মী তৈরির জন�য �ক শহর থেকে আরেক শহরে প�রশিক�ষণ দিয়ে বেড়িয়েছি। �ক জায়গায় কাজ শেষ হলে চলে যেতাম আরেক শহরে। ঢাকায় আমরা প�রতিদিন গড়ে ১০০ জনের গর�ভপাত করাতাম। ঢাকার বাইরের সংখ�যাটিও কাছাকাছিই ছিল। মেয়েদের �করকম অন�মতি নেওয়া হতো স�থানীয় প�নর�বাসন সংস�থার তরফে। যত দ�র মনে পড়ে, �কটি কাগজে তাদের সই নিয়ে রাখা হতো। �সবের পরোক�ষ সংগঠক ছিল সরকার।
যারা খানিকটা সামর�র�থ�যবান, তারা গোপনে কলকাতায় চলে যেত। আমাদের কাছে যারা আসত, তারা নিজেদের আগ�রহ থেকেই আসত। তাদের মধ�যে সব শ�রেণীর, সব ধর�মের নারীই ছিল। কাউকেই আমি কা�দতে বা ভেঙে পড়তে দেখিনি। তারা খ�বই শান�ত হয়ে থাকত। ফলে কাজটি আমাদের জন�য সহজ হতো।
যাদের বাচ�চা হয়ে গিয়েছিল, তারা নবজাতককে ত�লে দিত প�নর�বাসন সংস�থার হাতে। তারা আবার তাদের ত�লে দিত শিশ� দত�তকসংক�রান�ত গ�র�ত�বপূর�ণ সংস�থা ইন�টারন�যাশনাল সোশ�যাল সার�ভিসসহ (আই�স�স) অন�যান�য সংস�থার হাতে। গর�ভপাতকারী নারী ও নবজাতক−উভয়ের সংখ�যাই ছিল বিপ�ল। তখন বাংলাদেশের সহায়-সম�পদ কিছ�ই ছিল না। সামান�য যা ছিল, তা বরাদ�দ ছিল য�দ�ধাহত প�র�ষদের জন�য। ওষ�ধ, যন�ত�রপাতি−সব আমাকেই ইংল�যান�ড থেকে আনিয়ে নিতে হতো। ছয় মাস কাজের সময় আমার সম�বল ছিল মাত�র দ�ই সেট যন�ত�রপাতি।
আমি আসার আগেই ঢাকায় য�দ�ধনারীদের জন�য �কটি প�নর�বাসন সংস�থা গঠন করা হয়েছিল। �র দায়িত�বে ছিলেন বিচারপতি কে �ম সোবহান। ফন শ�ক (Von Schuck) নামের �ক ব�যক�তির ভ�মিকাও খ�ব ম�খ�য ছিল। তা�র স�ত�রীর নাম ছিল মেরি (দ�জনেরই প�রো নাম মনে নেই)। তা�রা অর�থসাহায�য জ�গিয়েছিলেন। আমরা কাজ করতাম মূলত হাসপাতাল বা প�নর�বাসনকেন�দ�রগ�লোতে...সঠিক মনে নেই, সেগ�লোকে তখন কী বলা হতো। সংস�থাটির নাম সম�ভবত বাংলাদেশ জাতীয় নারী প�নর�বাসন সংস�থা বা � রকম কিছ�।...হাসপাতালের কর�মচারীরা প�রথমে রাজি হতো না; ভাবত �টা বেআইনি কাজ। সে সময়ের স�বরাষ�ট�রসচিব রব চৌধ�রী � ব�যাপারে আমাকে সহযোগিতার জন�য আদেশসংবলিত ক�ষমতায়নপত�র দিয়ে দিয়েছিলেন। সেখানে বলা হয়, যা কিছ� আমি করছি, তা সম�প�র�ণ বৈধ �বং � ব�যাপারে আমি যাতে সব রকম সহযোগিতা পাই। বাংলাদেশের ওপর গ�চ�ছ গ�চ�ছ কাগজ আমার কাছে পড়ে আছে। সম�ভবত চিঠিটিও সেখানেই আছে। তখনই জানতাম, � রকম অভিজ�ঞতা বাকি জীবনে আর হবে না। তাই আমি সেগ�লো সংরক�ষণ করে রেখেছি। সে সময় � কাজ ছিল খ�বই কঠিন ও মর�মপীড়াদায়ক। হায়, �সব ইতিহাস আজকাল তো কেউ শ�নতে চায় না!
হ�যা�, কোনো কোনো মা সন�তানকে নিজের কাছেই রেখে দিয়েছিল। তাদের ভাগ�যে কী ঘটেছিল, সে ব�যাপারে আমার কোনো ধারণা নেই। আই�স�স যতজনকে সম�ভব দত�তক হিসেবে আমেরিকা ও পশ�চিম ইউরোপে পাঠিয়ে দিয়েছে। যতজনকে পাওয়া যায়, ততজনকেই নিতে রাজি ছিল তারা। গর�ভপাত বা প�রসবের পর মায়েরা কিছ�দিনের জন�য ত�রাণ ও প�নর�বাসন সংস�থার হেফাজতে থাকত। যত দিন ইচ�ছা সেখানে থাকা যেত। তারপর অনেকেই ঢাকা, দিনাজপ�র, রংপ�র, নোয়াখালীর মতো জায়গায় প�রশিক�ষণ কর�মস�চিতে অংশ নিত।
শিশ�দের প�নর�বাসনের বিষয়টি বেশ স�পর�শকাতর। �কটি কারণ �ই যে পাকিস�তান ছিল কমনওয়েলথভ�ক�ত দেশ �বং তাদের বেশির ভাগ কর�মকর�তারই প�রশিক�ষণ হয়েছিল ইংল�যান�ডে। ফলে বিষয়টি ব�রিটিশ সরকারের জন�যও বিব�রতকর ছিল। ক�মিল�লা কারাগারে বন�দী � রকম অনেক পাকিস�তানি কর�মকর�তার সাক�ষাৎকার নিয়েছিলাম আমি। তা�রা বলছিলেন, ‘য�দ�ধে তো অনেক কিছ�ই হয়! আমরা কী �মন করেছি!’
সবচেয়ে ভয়ঙ�কর যে তা�রা নারী-ধর�ষণকে জায়েজ মনে করতেন! টিਆা খানের (পূর�ব পাকিস�তানের সে সময়কার সামরিক আইন প�রশাসক) কাছ থেকে স�পষ�ট নির�দেশ পেয়েছিলেন, যেহেত� �কজন ভালো ম�সলিম তার বাবার বির�দ�ধে লড়বে না, সেহেত� যত বেশি সম�ভব বাংলাদেশি নারীদের গর�ভবতী করো। � থেকে �কটা গোটা প�রজন�ন জন�নাবে, যাদের শরীরে বইবে পশ�চিম পাকিস�তানিদের রক�ত। �টাই তারা বলেছিল �বং ধর�ষণের পেছনে �টাই ছিল তাদের তত�ত�ব! ধর�ষিতাদের যে সংখ�যাটি বাংলাদেশে স�বীকৃত, তা মোটেই বাড়িয়ে বলা নয়; বরং সংখ�যাটি আরও বেশি হতে পারে।
পাকিস�তানিরা যেভাবে �কেকটি শহর দখল করত, তা অদ�ভ�ত। গোলন�দাজ বাহিনীকে সামনে রাখা হতো। তারা স�ক�ল, হাসপাতাল লক�ষ�য করে বোমা মেরে চরম নৈরাজ�য সৃষ�টি করত। �রপর পদাতিক বাহিনী �সে সব বাসিন�দাকে �ক জায়গায় জড়ো করত। নিতান�তই যারা শিশ�, তারা বাদে বাকি সব মেয়েকে আলাদা করে ফেলা হতো। পদাতিকদের আরেকটি অংশ আওয়ামী লীগ বা পূর�ব পাকিস�তান সরকারের সঙ�গে জড়িত সবাইকে গ�লি করে মারার কাজ করত। তারপর মেয়েদের কোনো �কটি স�থানে আটকে রেখে তাদের ইচ�ছামতো ব�যবহার করত। পৃথিবীর আর কোথাও আমি �মনটি ঘটতে শ�নিনি। কিন�ত� বাংলাদেশে �টাই ঘটেছিল। নির�যাতনের অনেক গল�প শ�নেছি আমি। সেগ�লো ছিল অবিশ�বাস�য ও ভয়ঙ�কর। মান�ষ � রকম করতে পারে!
ধনী �বং স�শ�রীদের রাখা হতো কর�মকর�তাদের জন�য। বাকিদের ত�লে দেওয়া হতো সেপাইদের হাতে। তারা ঠিকমতো খাবার পেত না, অস�স�থ হলে জ�টত না চিকিৎসা। অজস�র নারী ক�যাম�পেই মরে যেত। কিন�ত� য�দ�ধের পরও �সব বিষয় অবিশ�বাস করার �ো�কটাই ছিল জোরালো। � প�রসঙ�গে কথা বলায় বাধা ছিল, ছিল নাকচ করার মানসিকতা। কিন�ত� আমি জানি−কী ঘটেছে, কত ব�যাপক আকারে ঘটেছে।
�মন বিভীষিকার মধ�য দিয়ে মেয়েদের যেতে হয়েছিল যে অনেকে নির�বাক হয়ে গিয়েছিল। নিয়ত তারা দ�ঃস�বপ�ন ও বিকারের মধ�যে থাকত। আমরা বিদেশি বলে আমাদেরও তারা বিশ�বাস করত না।
য�দ�ধের পর রেপ ক�যাম�পগ�লো ত�লে দেওয়া হয়েছিল। মেয়েদের পাঠিয়ে দেওয়া হতো যার যার গ�রাম বা শহরে। অনেক ক�ষেত�রে �মন হয়েছে, হয়তো স�ত�রীকে স�বামীর হাতে ত�লে দেওয়া হলো �বং লোকটি তাকে মেরে ফেলল! কোনো কোনো ক�ষেত�রে তারা জানতেও চাইত না, কী ঘটেছে তাদের স�ত�রীদের জীবনে। যম�না নদীতে তখন অনেক লাশ ভেসে যেতে দেখা যেত; অনেক লাশ পড়ে ছিল দেশের আনাচকানাচে।
কাউকে জিগ�যেস করলে বলত, মনে নেই। বাংলাদেশে মেয়েদের মর�যাদা �মনিতেই কম। প�র�ষেরা তো �কেবারেই ম�খ খ�লতে চাইত না। তাদের চোখে ওই সব নারী ‘নষ�ট’ হয়ে গেছে, তাদের মরে যাওয়াই ভালো। �বং অনেককে হত�যাও করা হয়েছিল। আমি প�রথমে বিশ�বাসই করতে পারিনি। পশ�চিমা কোনো সমাজে বিষয়টি �তই অচেনা, �তই অজানা!
জিওফ�রে ডেভিসের সঙ�গে ড. বীণা ডি’কস�টার আলাপচারিতা দীর�ঘক�ষণ চলে। ড. ডেভিস আবার বাংলাদেশে আসার জন�য ভীষণ উদ�বেল, বলেছেন ড. বীণা। য�দ�ধাপরাধ বিচারের জন�য �কটি ট�রাইব�য�নাল গঠনের সম�ভাব�যতার ব�যাপারে তা�রা কথা বলেন।
ড. বীণা লিখেছেন: ‘বিদায়ের আগে জিওফ বললেন, স�বিচার পাওয়ার জন�য বাংলাদেশের প�রচেষ�টাকে �গিয়ে নিতে তা�র ক�ষমতার মধ�যে যা সম�ভব যথাসাধ�য করবেন। জিওফ আমার হাত আ�কড়ে ধরে নিজের ব�কের ওপর রাখলেন। তা�র চোখ দিয়ে তখন অ�োরে অশ�র� �রছিল।’
দৃষ�টিপাত ডট অর�গ থেকে নেওয়া
অন�বাদ: ফার�ক ওয়াসিফ

[ম�ক�তমনা ম�ক�তিয�দ�ধ আর�কাইভের বাংলা সেক�‌শনের মেইন পেজ-� যেতে �খানে ক�লিক কর�ন]