বিজয় দিবস ২০০৭-এর কবিতা

সৌজন্যেঃ

বড় বাসনায়
মোহাম্মদ রফিক

মানুষের পায়ে-পায়ে
মানুষের হাতে-হাতে
নখে-নখে ঝরুক হূৎপিন্ড,

ডালে-ডালে পাতায়-পাতায়
সবুজাভ দিগন্ত পেরিয়ে
বিস্তারিত নির্জিত মাংসের ধুকপুক,

ঝরুক ঝরুক রক্ত শ্লেষ্ক্না ক্লেদ
এই বৃষ্টি এই রোদ ধানগুচ্ছে মাখামাখি
মাটির আড়ত ভেঙে সাগর-গর্জন,

হালের ফলায় অন্ত্রনালি
মাঠজুড়ে মাটির চাঙড়,
স্বপ্নবীজ মাথা তোলে ত্বক ফেঁড়ে লোমরাজি, ঘাস;

আশীর্বাদ করে যান পিতা
হে মাতা ধরণি, মাতৃস্তনে
চালিয়েছে বিষাক্ত খঞ্জর,

আমি পুত্র, আজ ভোরে মুখোমুখি অন্তিম যাত্রায়,
অতঃপর হাঁটছি পাশাপাশি, চতুর্দিকে
লোবানের পুষ্কপ ও পাপড়ির আরাধনা, আর্তনাদ!

রান্নাঘরগুলি
রফিক আজাদ

আমাদের রান্নাঘরগুলি থেকে উঠে আসে ধোঁয়া−
খাবারের স্বাদু গন্ধ আসে উঠে, কুয়াশাও ওঠে,
ধোঁয়াশায় মিলেমিশে একাকার হতে থাকে ক্রমে!

আজ বেশ বিকশিত রান্নাঘরকেন্দ্রিক চিন্তারা,
এরা পরস্পর মিত্র কি না বোঝা মুশকিল!
বৈরিতা বা সৌহার্দ্য এক্ষেত্রে বড় কথা নয়−
সুগন্ধি খাবার থেকে ঊর্ধ্বমুখী ধোঁয়ারা বিলীন;
উত্থিত ধোঁয়ারা বেশ স্বাস্থ্যবান এবং স্বাধীন!

স্বাধীনতাহীনতায় কুয়াশারও ক্ষয়-ক্ষতি খুব−
কৃষকেরও চাষবাস নিশ্চিতই ব্যাহত দারুণ।

অঘ্রাণের ধুমল সন্ধ্যায় ছায়াচ্ছন্ন মানুষের
চলাফেরা রূপকথা-জগতের মতো মনে হয়!
দু-একটি রাতপাখি ডেকে উঠে তছনছ করে
নৈঃশব্দ্যের হিমেল নিভৃতি;−সুর্য ওঠে অবশেষে
১১/১২/২০০৭


মুক্তিযোদ্ধা ’৭১
তানভীর মোকাম্মেল

এখনও কি দাঁড়াও এসে কোনো শীতভোরে
শিমুল গাছটার আড়ালে চোখে
বিদ্যুতের ঝিলিক তুলে দেখ নদীর ওপারে
শত্রুর বাঙ্কার

যা তোমার একমাত্র অহঙ্কার কাঁধে ফেলে
পুরোনো বান্ধব রাইফেলটি হেঁটে যাও
অজানা গাঁয়ের পথে দাও শিস্ কিংবা ভাব
আনমনে ফেলে আসা কারও শেষ কথাটি;

কখনও কি থমকে দাঁড়াও
সীমান্তের পথের ধারে
দেখ চেয়ে সুদীর্ঘ মানবতা শ্রান্তপায়ে
হেঁটে যায় হেঁটে যায়
কোন এক অগস্ত্য যাত্রায়;

শক্ত চোয়ালে
অজান্তেই ট্রিগারে রাখ হাত
তোমার গন্তব্য জান কেবল তুমি আর
নীরব কমান্ডার;

স্বল্প সময়েই শিখেছ শব্দগুচ্ছ অচিন
এলএমজি, রেকি, অ্যামবুশ, গ্রেনেডের পিন
এসবই বর্ম আজ তোমার আর স্নৃতি
সিগারেটের অংশ নিয়ে খুনসুটি সহযোদ্ধার
লাশের পাশে দাঁড়ানো বিষণ্নতা
কালো ইঁদারার;

আর স্বপ্ন অনেকগুলি
রক্তবিল সাঁতরে আবার
দাঁড়াবে চিরচেনা পুঁইমাচা আঙিনায়
রান্নাঘর থেকে মা হাত মুছতে মুছতে
কান্নাভেজা কন্ঠে ‘ফিরেছিস বাবা, আয়!’ বন্ধু
ছুটে এসে বলবে ‘শুনেছিস সব কথা!’ ছোট ভাইটি
অপার আগ্রহ নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখবে
তোমার অস্ত্রটি আর সে মেয়েটি
চৌকাঠের আড়াল থেকে চেয়ে রবে
সলজ্জ কৌতুকে;

কিছুটা বিব্রত কাদামাটি মাখা পায়ে
দাঁড়ানো তোমার উপর
শিউলি ফুলের মতো ঝরবে
হাজার বছরের বেহুলা বাংলার আশীর্বাদ;

আকাশের ছুটে চলা নক্ষত্রেরা জানে
প্রতিটা সভ্যতার রংধনু ভোরে
জন্ন নাও তুমি
অজেয় মুক্তিযোদ্ধা।

প্রথম আলো, ১৬ ডিসেম্বর ২০০৭

[আর্কাইভের বাংলা সেক্‌শনের মেইন পেজ-এ ফিরে যেতে এখান ক্লিক করুন]