ভাই, দেশটা কোন দিকে যাচ্ছে?
মুহম্মদ জাফর ইকবাল
আজকাল কারও সঙ্গে দেখা হলে দু-একটা কথার পর অবধারিতভাবে তিনি জানতে চান, ‘ভাই, দেশটা কোন দিকে যাচ্ছে বলতে পারবেন?’ খবরের কাগজে আমি মাঝেমধ্যে লিখি বলে অনেকেরই ধারণা, আমি হয়তো অনেক কিছু জানি, অনেক কিছু বুঝি। ব্যাপারটা আসলে মোটেও সে রকম নয়। গত পাঁচ বছর লুটপাটের নেতৃত্ব দিয়েছেন খালেদা জিয়া, ট্যাক্স ফাঁকি দিয়েছেন খালেদা জিয়া, কালো টাকা সাদা করেছেন খালেদা জিয়া; কিন্তু ঝপ করে অ্যারেস্ট হয়ে গেলেন শেখ হাসিনা−এই ব্যাপারগুলো বোঝা কি সহজ ব্যাপার? আমি নিজে বুঝি না, আমার চারপাশের কেউই বোঝে না, প্রথম প্রথম ভেবেছিলাম যাঁরা দেশটা চালাচ্ছেন তাঁরা হয়তো বোঝেন, এখন মনে হচ্ছে তাঁরাও বোঝেন না।সত্যি কথা বলতে কি সে জন্য তাঁদের দোষও দেওয়া যায় না। অনেক হইচই করে নির্বাচন করে যখন একটা রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসে, তারা ডজন ডজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী নিয়ে দেশ চালায় পাঁচ বছর−এতেই তাদের মোটামুটি বারোটা বেজে যায়। অথচ এই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মাত্র ১০ জন উপদেষ্টা নিয়ে টানা দুই বছর দেশ চালানোর সাহস করে ফেলেছেন। যাঁরা উপদেষ্টা হয়েছেন তাঁরা যে খুব অভিজ্ঞ, তাঁদের খুব সামাজিক দায়বদ্ধতা আছে তাও নয়, তাই ছয় মাস যেতে না যেতেই আমরা সেটা টের পেতে শুরু করেছি। অনেক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে কোনো সিদ্ধান্ত নেন না, নিতে ভয় পান (উদাহরণ: শিক্ষা)। অনেক জায়গায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন নেই, আগ বাড়িয়ে নিয়ে বসে থাকেন (উদাহরণ: পাটকল)। ব্যাপারটা যখন পুরোপুরি লেজে-গোবরে হয়ে যায় তখন তাঁরা হৃদয়হীন কথাবার্তা বলতে শুরু করেন। আমরা তখন চমকে চমকে উঠি, জোট সরকারের আমলে আমরা যে কথাগুলো শুনেছি, হুবহু সেই কথাগুলো শুনে আমরা অবাক হয়ে ভাবি, তাহলে কি জোট সরকারের প্রেতাত্মা এই সরকারের মাঝে বেঁচে আছে?
এত অল্প কয়েকজন অনভিজ্ঞ উপদেষ্টা ১৪ কোটি মানুষের এত বড় একটা দেশ চালাতে গিয়ে নিশ্চয়ই হিমশিম খাচ্ছেন, তাই তাঁদের জন্য যেটা সহজ সেটাই করছেন, আগে যেভাবে চলত সেভাবেই চলতে দিচ্ছেন। বাংলাদেশের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর সময়টি ছিল গত জোট সরকারের আমল। বিএনপি এবং জামায়াত মিলে এই দেশটাকে যেভাবে লুটেপুটে খেয়েছিল, সেটা নিজের চোখে দেখে, নিজের কানে শুনেও বিশ্বাস হতে চায় না। টাকা-পয়সার দুর্নীতি থেকেও বড় দুর্নীতি ছিল প্রশাসনের একেবারে রন্ধেછ রন্ধেછ নিজেদের লোক বসিয়ে যাওয়ার দুর্নীতি। উপদেষ্টারা যখন হাল ছেড়ে দিয়েছেন (কিংবা হাল ধরারই সময় পাচ্ছেন না কিংবা আরও ভয়ের কথা, হাল ধরারই সাহস পাচ্ছেন না) তখন প্রশাসনের সেই আগের মানুষগুলোই দেশ চালাচ্ছে, ঠিক সেই আগের মতোই! এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার যদি সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে ৯০ দিনে ইলেকশন দেওয়ার থেকে তাদের অনেক বড় পরিকল্পনা আছে, তাহলে কি সে রকম একটা প্রস্তুতির প্রয়োজন ছিল না? বেশি উপদেষ্টা যদি সম্ভব না হয়, তাহলে কি দক্ষ উপদেষ্টা হতে পারত না? এখনো কি সময় নেই?
এই সরকার খুব বড় একটা সুযোগ পেয়েছিল, এত বড় একটা সুযোগ ভবিষ্যতে আর কোনো সরকার কোনো দিন পাবে বলে মনে হয় না। অত্যন্ত অস্থির একটা সময়ে তারা দেশের দায়িত্ব নিয়েছিল, সাধারণ মানুষকে তারা ভবিষ্যতের সুন্দর একটা বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়েছিল। যেহেতু তারা কোনো রাজনৈতিক দলের সরকার ছিল না, তারা ইচ্ছা করলে রাজনৈতিক দলের সীমাবদ্ধ জগতের বাইরের খুব বড় বড়, খুব মহান সিদ্ধান্ত নিতে পারত। আমার মনে হচ্ছে, এই অসাধারণ সুযোগটি তারা অবহেলায় নষ্ট করছে। কত দ্রুত তারা এই দেশের মানুষের ভালোবাসা হারাচ্ছে তারা কি সেটা জানে? এই সরকার ব্যর্থ হলে কী ভয়ঙ্কর পরিণতি হবে, উপদেষ্টারা এর মধ্যে সেটা নিয়ে আমাদের ভয় দেখাতে শুরু করেছেন। ব্যাপারটা কি একটু ছেলেমানুষী এবং হাস্যকর হয়ে গেল না? আমাদেরই কি এই সরকারকে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় দেখানোর কথা নয়?
২.
সবকিছু নিয়ে মাঝেমধ্যে যখন মন খারাপ হতে চায় তখন আমি জানুয়ারির ১১ তারিখের কথা ভাবি। সেই দিন যদি পট পরিবর্তন না হতো, তাহলে হয়তো জানুয়ারির ২২ তারিখ সত্যি সত্যি কোনো এক ধরনের নির্বাচন হয়ে যেত। বিএনপি এবং জামায়াতের সেই ভয়ঙ্কর মানুষগুলো আবার ক্ষমতায় এসে তখন এই দেশটার কী অবস্থা করত? সেই ভয়াবহ পরিণতি থেকে রক্ষা করার জন্য আমি সব সময় এই সরকারের প্রতি মনে মনে কৃতজ্ঞতা জানাই। বিএনপি এবং জামায়াত সরকার তাদের আমলে নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, বিচার বিভাগ, পুলিশ, সরকারি কর্মকমিশন, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন−এ রকম প্রতিটা গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে দিয়েছিল। এই সরকার এ রকম প্রতিটা প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে ওপরের পদে বিশ্বাসযোগ্য একজন খাঁটি মানুষকে বসিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো রক্ষা করার চেষ্টা করছে। তারা যদি এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে রক্ষা করতে পারে, আমি মনে করি সেটা দেশের জন্য একটা বিশাল বড় কাজ হবে।আমি মনে করি, আমার মতো আরও অনেকে এই সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টাগুলোকে মমতার সঙ্গে বিবেচনা করে ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছে−তাদের সবাইকে নিরাশ করাটা হবে খুব দুঃখের একটা ব্যাপার।
৩.
অনেকেই হয়তো লক্ষ করেছেন, এই সরকারের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে আজকাল সংবাদপত্রগুলো প্রায়ই বলে ‘সেনাসমর্থিত সরকার’। তার মানে কিন্তু এই নয় যে নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারগুলো হচ্ছে ‘সেনা অসমর্থিত’ বা তাদের প্রতি সেনাবাহিনীর সমর্থন থাকে না। ‘সেনাসমর্থিত’ কথাগুলো যোগ করে দিয়ে আমাদের মনে করিয়ে দেওয়া হয় যে এই সরকারের ইচ্ছা-অনিচ্ছা অনেক কিছুই সেনাবাহিনীর ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভর করছে। এটা সত্যিকারের সামরিক শাসন নয়, কিন্তু তার গন্ধটুকু আছে। এই তো সেদিন ঢাকা বিশ্বদ্যিালয়ের একজন ছাত্র আমাকে অভিযোগ করে বলেছেন, সেনা সদস্যরা এসে তাঁর লম্বা চুল কেটে ফেলতে চেয়েছে। সামরিক শাসনের প্রথম চিহ্নটা সব সময়ই লম্বা চুল কাটার উৎসাহ দিয়ে শুরু হয়। ভাগ্যিস কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম বা বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের মতো মানুষদের এখন বাংলাদেশে থাকতে হচ্ছে না, তাহলে তাঁদের মানসম্মান নিয়েই টানাটানি পড়ে যেত!কিন্তু কেউ যেন মনে না করেন, আমি চুল কাটা নিয়ে অভিযোগ করতে এসেছি, বাংলাদেশে এখন সেনাবাহিনীর কিছু সদস্য নিয়ে আরও বড় বড় অভিযোগ আসছে। অন্য সবার বিরুদ্ধে অভিযোগের কথা খবরের কাগজে ছাপানো যায়, কিন্তু সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগের কথা খবরের কাগজে ছাপানো খুবই কঠিন। তার পরও আমরা দেখতে পেয়েছি, ১৬ আগস্ট প্রথম আলোয় ছাপা হয়েছে−কুমিল্লায় আলমগীর হোসেন নামে একজন রাজমিস্ত্রীকে সেনাসদস্যরা পিটিয়ে মেরে ফেলেছেন। আরেকজনের পা থেঁতলে দেওয়া হয়েছে; সে এখন হাসপাতালে। মানুষটির অপরাধ−হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হওয়ায় সে দৌড়ে একজনের ছাতার নিচে আশ্রয় নেওয়ার দুঃসাহস দেখিয়েছিল! সেই ছাতার নিচে একজন খুব বড় সেনা কর্মকর্তার আত্মীয়া ছিলেন। খবরের কাগজ তন্ন তন্ন করেও সেই সেনা কর্মকর্তার নাম খুঁজে পেলাম না। এই দেশে কী তাদের জন্য একটা অলিখিত ইনডেমনিটি ঘোষণা করা হয়েছে?
কিছুদিন আগে আমার কাছে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কিছু কাগজপত্র এসেছে। সেখান থেকে একটা অত্যন্ত বিচিত্র তথ্য জানতে পেরেছি। গত ২ জুলাই স্থানীয় এরিয়া কমান্ডার হিসেবে সেনাবাহিনীর মেজর ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সঙ্গে দেখা করে একটি বিভাগের পাঁচজন শিক্ষককে নিয়োগ দেওয়ার ‘নির্দেশ’ দেন। উপাচার্য মহোদয় সেই নিয়োগপত্র ইস্যু করতে বাধ্য হন এবং রহস্যময় কারণে তিনি খুব গোপনে পদত্যাগ করে ফেলেন। ভেতরের ব্যাপার আমরা কিছু জানি না; শুধু এটুকু জানি−এই দেশে, এই সময়ে একটা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে একজন মেজর পাঁচজন শিক্ষকের নিয়োগপত্র ইস্যু করিয়ে নিয়ে যেতে পারেন! এটা চলেশ রিছিল হত্যা বা রাজমিস্ত্রী আলমগীর হোসেন হত্যার মতো হৃদয়বিদারক নৃশংস ঘটনা নয়, কিন্তু দেশের জন্য এটা খুব বড় ঘটনা। যদি এটাই একটা নুতন প্রক্রিয়ার শুরু হয়ে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্তিত্ব বলে কিছু থাকবে না।
আমাদের দেশের সেনাপ্রধান অনেকবার দেশের রাজনৈতিক নেতাদের কাজকর্মের সমালোচনা করেছেন। স্বাধীনতার পর অর্ধেক সময় সেনাবাহিনী এবং বাকি অর্ধেক সময় রাজনীতিবিদেরা দেশ শাসন করেছেন, কিন্তু অপশাসনের পুরো দায়িত্বটুকুই নিতে হয় রাজনীতিবিদদের। আমরা খুব ভালো করে জানি, এ দেশের সেনা শাসকেরা দেশের অনেক বড় সর্বনাশ করেছেন, কিন্তু তাঁদের সে জন্য কখনো দায়ী করা হয় না। এ মুহুর্তে দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে সামরিক শাসন নেই, কিন্তু সারা দেশেই সেনাবাহিনীর এক ধরনের সচেতন উপস্থিতি অনুভব করা যায়। দেশের ছোট ছোট শহরগুলো থেকে অনেকে কাতর গলায় আমার কাছে নির্যাতনের কাহিনী বলেছেন। আমি শুধু শুনেছি, তাঁদের সুবিচার পাওয়ার পথ দেখাতে পারিনি। কিন্তু চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ঘটনাটি সম্ভবত সবাইকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেশের প্রকৃত অবস্থাটার কথা স্নরণ করিয়ে দেবে।
৪.
আমাদের সেনাপ্রধান জেনারেল মইন উ আহমেদ মুক্তিযোদ্ধাদের একটি আয়োজনে বলেছিলেন, এই দেশের মাটিতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা হবে। বাংলাদেশকে তার সত্যিকার অবস্থানে দাঁড় করানোর প্রথম পদক্ষেপ যদি হয় বঙ্গবন্ধুকে জাতির পিতা হিসেবে ঘোষণা দেওয়া, তাহলে দ্বিতীয় পদক্ষেপটিই হবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা। এই সরকার দেশের দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই জেনারেল মইন উ আহমেদ দুটো ঘোষণাই দিয়ে দেশের মানুষের হৃদয় জয় করেছিলেন। আমরা সবাই আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছিলাম।তারপর অনেক দিন পার হয়ে গেছে। মাঝেমধ্যে এখনো ভাসা ভাসাভাবে বঙ্গবন্ধুর কথা শুনি কিন্তু যুদ্ধাপরাধীর বিচারের কথাটা একেবারেই চাপা পড়ে গেছে। বরং একজন উপদেষ্টার মুখে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে সাফাই গাইতে শুনে আমরা রীতিমতো আঁতকে উঠেছি।
এ রকম একটা অবস্থায় আমি যদি প্রতারিত অনুভব করি, তাহলে কি কেউ আমাকে দোষ দিতে পারবে? সেনাপ্রধান জেনারেল মইন উ আহমেদ কি পরিষ্ককার করে আমাদের জানাবেন, এই দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার যে প্রতিশ্রুতিটুকু দিয়েছিলেন, সেই প্রতিশ্রুতিটুকু কি তিনি রাখবেন?
৫.
সারা দেশে এখন থই থই বন্যা। সেদিন একটা ত্রাণ কমিটির সঙ্গে কাছাকাছি একটা জায়গায় গিয়েছিলাম। বন্যার ত্রাণে কোনো কার্যকর ভুমিকা রাখার জন্য যাইনি, গিয়েছিলাম নিজের চোখে দেখতে। সব সময় যা হয়, তা-ই হলো। গিয়ে দেখা গেল যেটুকু ত্রাণ নিয়ে যাওয়া হয়েছে, মানুষ তার থেকে অনেক বেশি। যারা ত্রাণ পায়নি, তাদের শুকনো মুখ দেখে বুকটা ভেঙে যায়। এক মুঠো খাবারের জন্য একজন শিশু তার মায়ের হাত ধরে ম্লান মুখে দাঁড়িয়ে আছে, পৃথিবীতে এর চেয়ে করুণ দৃশ্য কি আর কিছু হতে পারে?যারা স্থানীয় মানুষ, আমি তাদের কাছ থেকে বন্যার খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। আমাদের দেশের কিছু বিখ্যাত বন্যা আছে (আটানব্বইয়ের বন্যা, দুই হাজার চারের বন্যা), সেই তুলনায় এটা কী রকম জানতে চেয়েছিলাম। সবাই দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘পানি আগের থেকে বেশি হবে না কম হবে আমরা সেটা জানি না। কিন্তু এই বন্যাটা হবে সবচেয়ে ভয়াবহ। তার কারণ হচ্ছে জিনিসপত্রের দাম। আগে মানুষজন যে জিনিসটা কোনোভাবে কষ্ট করে কিনতে পেরেছে, এই বছর কেউ তার ধারে-কাছে যেতে পারছে না।’ অনাগত দিনগুলোর কথা ভেবে সবাই ম্লান মুখে দাঁড়িয়ে থাকে।
প্রকৃতি এসে প্রতি বছরই আমাদের ওপর এই আঘাত করে যায়, কিন্তু আমরা যখন প্রকৃতির ওপর অপেক্ষা না করে যেচে পড়ে মানুষের ওপর আঘাত করি তখন তার জবাব কে দেবে? কথা নেই, বার্তা নেই কলমের এক খোঁচায় পাটকলগুলো বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে, সেই সিদ্ধান্তগুলো কে নিচ্ছে? আমাদের দেশের পাটশিল্পকে একেবারে সর্বনাশের মুখে ঠেলে দিয়েছে বিজেএমসি নামে যে প্রতিষ্ঠান, আমরা তাদের কেন শাস্তি দিচ্ছি না, দুর্নীতির জন্য তাদের কেন জেলে নিচ্ছি না? তা না করে শাস্তি দিচ্ছি পাটকল শ্রমিকদের! আমি লিখে দিতে পারি যে উপদেষ্টা কাগজে স্বাক্ষর করে পাটকলগুলো বন্ধ করেছেন, তিনি যদি সেই এলাকায় গিয়ে অভুক্ত শিশুগুলোকে নিজের চোখে একবার দেখে আসতেন তাহলে কোনো দিন সেই পাটকলগুলো বন্ধ করতে পারতেন না−তিনি তাঁর উপদেষ্টার চাকরি ছেড়ে দিয়ে ঘরে এসে বসে থাকতেন।
আমি যখন খুব ছোট তখন একবার গ্রামে গিয়েছি এবং আমার এক চাষি মামা আমাকে একটা খুব মজার জিনিস বলেছিলেন। প্রকান্ড একটা তেজী ষাঁড়কে মাঠে খুঁটি দিয়ে বেঁধে রাখতে রাখতে বলেছিলেন, ‘এই যে ষাঁড়টা দেখছ, এর গায়ে এত জোর যে সে যদি শুধু তার ঘাড়টা দিয়ে একটা হ্যাঁচকা চান দেয়, দড়িটা পটাং করে ছিঁড়ে যাবে! ষাঁড়টা সেটা জানে না বলে আমরা এটাকে বেঁধে রাখতে পারি−তা না হলে এটাকে বেঁধে রাখার সাধ্য কারও আছে?’
গত কিছুদিন থেকে আমার শুধু সেই ষাঁড়ের কথা মনে হচ্ছে−দেশের অবস্থা অনেকটা সে রকম। দেশের মানুষ তেজী ষাঁড়ের মতো−তাদের গলায় জরুরি অবস্থা, যৌথ বাহিনী, পুলিশ, মিলিটারি, র্যাব, মামলা-মোকদ্দমার একটা পলকা দড়ি। মানুষ রাজি আছে বলে সেটা গলায় ঝুলিয়ে অপেক্ষা করছে−কোনো কারণে যদি অধৈর্য হয়ে যায়, অশান্ত হয়ে যায়, একটা হ্যাঁচকা টান দিলেই সেটা পটাং করে ছিঁড়ে যাবে। এই সরকারের কাছে বিনীত অনুরোধ, দেশের মানুষকে অশান্ত করবেন না, মাঠে-ঘাটে ছুটে যাওয়া ক্ষিপ্ত ষাঁড়কে আমরা আর দেখতে চাই না।
৬.
এটা আগস্ট মাস, বঙ্গবন্ধুকে স্নরণ করার মাস। কোন সরকার কখন কীভাবে তাঁকে কতটুকু সম্মান দেবে আমরা জানি না, কিন্তু যত দিন বাংলাদেশ নামে দেশটি পৃথিবীতে টিকে থাকবে, তত দিন এই মানুষটিও পৃথিবীর ইতিহাসে বেঁচে থাকবেন। বাংলাদেশ এবং বঙ্গবন্ধু সমার্থক শব্দ। যদি বঙ্গবন্ধুর জন্ন না হতো তাহলে এই বাংলাদেশেরও জন্ন হতো না।তাঁর জন্য এই দেশের দুঃখী মানুষের পক্ষ থেকে ভালোবাসা এবং ভালোবাসা।
মুহম্মদ জাফর ইকবাল: লেখক। অধ্যাপক, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।