কাজী মোতাহার হোসেন
বিজ�ঞানচর�চা ও বিজ�ঞানচিন�তা

৩০ জ�লাই কাজী মোতাহার হোসেনের ১১০তম জন�নবার�ষিক। তা�র বিজ�ঞানচর�চা নিয়ে লিখেছেন আব�ল আহসান চৌধ�রী

কাজী মোতাহার হোসেন (১৮৯৭-১৯৮১) তা�র �ক স�নৃতিচর�চায় নিজের যথার�থ পরিচয় কোনটি সে বিষয়ে বলতে গিয়ে কিছ�টা কৌত�ক করে প�রশ�ন ত�লেছিলেন, ‘আমার সম�বন�ধে কথা উঠেছে, আমি দাবাড়�, না বৈজ�ঞানিক, না সাহিত�যিক?’ � প�রশ�নের জবাবে অনায়াসে বলা যায়, মোতাহার হোসেন �র সব কয়টি পরিচয়েই বিখ�যাত ও বিশিষ�ট। �সব গ�ণের যেকোনো �কটিকে অবলম�বন করেই তিনি জাতীয় ব�যক�তিত�বের অধিকারী হতে পারতেন। তবে দাবাড়� ও সাহিত�যিক খ�যাতির কাছে তা�র বিজ�ঞানসাধকের পরিচয়টি যে কিছ�টা প�রচ�ছন�ন−� কথা অবশ�য কব�ল করতেই হয়।

কাজী মোতাহার হোসেন ছিলেন বিজ�ঞানের ছাত�র ও শিক�ষক। তা�র চিন�তা-চেতনার �কটা বড় অংশ জ�ড়ে ছিল বিজ�ঞান। বিজ�ঞান নিছকই তা�র পেশাগত পঠন-পাঠনের বিষয় ছিল না। অধ�যয়ন-অধ�যাপনার স�ত�রে বিজ�ঞান বিষয়ে তা�র সন�ধিৎসা-কৌত�হল ও মৌলিক চিন�তাও ছিল। বিজ�ঞানকে তিনি নিছক য�ক�তি-প�রমাণের প�রণালীবদ�ধ শৃঙ�খলা-শাস�ত�র বিবেচনা করেননি−তিনি �কে দিয়েছিলেন সৃষ�টিশীল শাস�ত�রের মর�যাদা।
মোতাহার হোসেন তা�র বিজ�ঞানদৃষ�টি ও চেতনার জন�য জ�যোতীন�দ�রমোহন রায়, ডব�লিউ � জেনকিন�স, সত�যেন�দ�রনাথ বস� ও প�রশান�তচন�দ�র মহলানবীশের কাছে গভীরভাবে ঋণী। জ�যোতীন�দ�রমোহন ছিলেন তা�র স�ক�লজীবনের শিক�ষক, জেনকিন�স কলেজ-বিশ�ববিদ�যালয় পর�যায়ের শিক�ষক, সত�যেন�দ�রনাথ বিশ�ববিদ�যালয়ের শিক�ষক-সহকর�মী ও প�রশান�তচন�দ�র তা�র পরিসংখ�যানবিদ�যার গ�র�।

তা�র সলতে পাকানোর কাজটি হয়েছিল ছেলেবেলাতেই। বাল�যপাঠের কালে তা�র গাণিতিকবিদ�যার হাতেখড়ি হয়েছিল খেলার ছলে। মূলে ছিল তা�র বাবার আন�তরিক প�রয়াস। �র ফলে ‘অঙ�কের জ�ঞান’ সহজেই তা�র ‘মনের ভিতরে সঞ�চিত হয়েছিল।’ সেই ছেলেবেলাতেই তা�র উদ�ভাবনী শক�তি জন�ন নিয়েছিল। গ�রামের স�ক�লের শিক�ষক তা�কে ‘যোগ-বিয়োগ ও গ�ণনের পদ�ধতি শিখিয়েছিলেন’। তারপর ভাগের নিয়ম তিনি ‘নিজে নিজেই আবিষ�ককার করে’ শিক�ষককে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। পরে যখন তিনি ক�ষ�টিয়া হাইস�ক�লের ছাত�র, তখন যন�ত�র ও কল-কবজার প�রতি কৌত�হলের কারণে �কবার কেমন বিপত�তিতে পড়েছিলেন সে কথা জানা যায় তা�র স�ক�লজীবনের স�নৃতিকথায়।

�ই ক�ষ�টিয়া হাইস�ক�লেরই শিক�ষক ছিলেন জ�যোতীন�দ�রমোহন রায়। মোতাহার হোসেন যা�কে স�ক�ল-কলেজ-বিশ�ববিদ�যালয় মিলিয়ে তা�র ‘শ�রেষ�ঠ শিক�ষক’ বলে রায় দিয়েছেন। ��র কাছেই মোতাহার হোসেন নিচের ক�লাসে জ�যামিতি ও ওপরের ক�লাসে মেকানিকস বা ‘গতিবিজ�ঞান, স�থিতিবিজ�ঞান ও যন�ত�রবিজ�ঞান’ পড়েছেন। তা�র � শিক�ষকের পড়ানোর ধরনটাই ছিল আলাদা। ক�লাসর�মের বাইরে নিয়ে গিয়ে হাতে-কলমে জ�যামিতি শেখাতেন। কখনো ছাত�রদের নিয়ে যেতেন প�রোনো নীলক�ঠিতে তার ব�যাসার�ধ মেপে বের করার জন�য। কখনোবা নিজে টিকিট কেটে ছাত�রদের সার�কাস দেখাতে নিয়ে যেতেন, বিনোদনের পাশাপাশি ‘ইনারশিয়া’ ও ‘সার�ক�লার মোশন’ বো�ানোর জন�য।

জ�যোতীন�দ�রমোহন হাতে-কলমে বিজ�ঞানশিক�ষা দেওয়ার জন�য ছাত�রদের কাঠের গোল তক�তায় কাগজ সে�টে ‘গণিতমিটার’ তৈরি করিয়ে তাদের উদ�ভাবন আগ�রহকে উসকে দিতেন। শ�ধ� বিজ�ঞানশিক�ষা নয়, বিজ�ঞানমনস�কতা, ম�ক�তব�দ�ধি, নীতি-নৈতিকতা আর মানবিকতার প�রথম পাঠও তিনি পেয়েছিলেন তা�র �ই স�ক�লশিক�ষকের কাছ থেকেই।

অধ�যাপক সত�যেন�দ�রনাথ বস� মোতাহার হোসেনের প�রত�যক�ষ শিক�ষক ছিলেন না−ছিলেন বিশ�ববিদ�যালয়ের বিভাগীয় সহকর�মী। কিন�ত� জিজ�ঞাস� মোতাহার হোসেন �কজন শিক�ষার�থীর কৌত�হল নিয়েই কখনো গণিতের জটিল প�রশ�নের সমাধানের জন�য তা�র শরণাপন�ন হতেন, আবার কখনোবা অধ�যাপক বস� নিজেও নানা ধরনের ‘ক�ট অঙ�কে’র সমাধান করতে গিয়ে তা�কে ‘বাজিয়ে নিতেন’। মোতাহার হোসেন �ভাবে অধ�যাপক বস�র প�রিয় ও কাছের মান�ষ হয়ে ওঠেন। অধ�যাপক বস�র প�রেরণাতেই মোতাহার হোসেনের পরিসংখ�যানবিদ�যা শেখা সম�ভব হয়েছিল। গণিতে মোতাহার হোসেনের আগ�রহ ও অধিকার লক�ষ করেই তিনি � সিদ�ধান�ত নিয়েছিলেন। আর সেই তিরিশের দশকেই সত�যেন বস�র অন�সরণে তিনি বাংলা ভাষায় পদার�থবিদ�যা পড়াতে শ�র� করেন। অধ�যাপক বস�র পরামর�শে তিনি বাংলায় পদার�থবিদ�যার ব�যবহারিক শিক�ষার বইও লিখেছিলেন। বিজ�ঞানের জটিল বিষয়কে ইংরেজি থেকে বাংলা ভাষায় রৃপান�তরের �ো�কও সৃষ�টি হয় অধ�যাপক বস�র উৎসাহে। সত�যেন বস�র কোয়ান�টাম থিওরি সংক�রান�ত গবেষণা-নিবন�ধ বাংলায় তর�জমা করেন তিনি ‘�লকবাদ’ নামে, ছাপা হয়েছিল প�রবাসী পত�রিকায় ।

সত�যেন বস� তা�কে পরিসংখ�যানবিদ�যা পড়তে পাঠিয়েছিলেন ভবিষ�যতের ভাবনা মাথায় রেখে। সত�যেন বস�র ‘স�মেহ ও অন�গ�রহেই’ ১৯৩৯ থেকে তিনি তথ�যগণিত পড়াতে শ�র� করেন। পরে � বিষয়ে স�বতন�ত�র বিভাগের সৃষ�টি হয়,। আরও পরে প�রতিষ�ঠিত হয় ইনস�টিটিউট। মোতাহার হোসেন সগর�বে স�নরণ করেছেন যে কলকাতা বিশ�ববিদ�যালয়ের আগেই ঢাকা বিশ�ববিদ�যালয়ে পরিসংখ�যান বিভাগে স�মাতক সম�মান কোর�স চাল� হয়।
সত�যেন বস� শ�ধ� যে মোতাহার হোসেনকে পরিসংখ�যানবিদ�যা শিখতে পাঠিয়েছিলেন তা-ই নয়, ব�লক ডিজাইন সম�পর�কে গবেষণায়ও তা�কে উৎসাহিত করে তোলেন, তা�র পি�ইচডি গবেষণাপত�রটিরও প�রয়োজনীয় সংশোধন করে দেন। তা�র �ই গবেষণা অভিসন�দর�ভের �কজন পরীক�ষক ছিলেন বিশ�ববিশ�র�ত পরিসংখ�যানবিদ স�যার রোনাল�ড ফিশার। তিনি যে প�রশংসাপূর�ণ মন�তব�য করেছিলেন তার �কটি বাক�য ছিল � রকম−‘হি হ�যাজ গন মোর ডিপলি ইনট� দ�য সাবজেক�ট দ�যান �নি প�রিভিয়াস রাইটার। উত�তর সময়ে মোতাহার হোসেন-উদ�ভাবিত পদ�ধতি সংখ�যাতত�ত�বশাস�ত�রে ‘হোসেনস চেইন র�ল’ নামে স�বীকৃতি পায়।

ডব�লিউ � জেনকিন�সের কাছে মোতাহার হোসেন নানা কারণে ঋণী। তিনি ছিলেন তা�র পদার�থবিজ�ঞানের প�রিয় শিক�ষক। মেধাবী ও জিজ�ঞাস� ছাত�র হিসেবে মোতাহার হোসেন জেনকিন�সের মনোযোগ কেড়েছিলেন। ঢাকা বিশ�ববিদ�যালয় ছেড়ে যাওয়ার সময় মোতাহার হোসেনের কথা বিশেষ করে সত�যেন বস�কে বলে যান। �র আগে ১৯২১ সালের গোড়াতেই জেনকিন�সের কল�যাণে �ম� পরীক�ষার�থী মোতাহার হোসেন নবপ�রতিষ�ঠিত ঢাকা বিশ�ববিদ�যালয়ে প�রদর�শক হিসেবে প�রবেশের স�যোগ লাভ করেন। কিছ� পরে তিনি পূর�ণ শিক�ষক হিসেবে নিয়োগ পান। জেনকিন�সের আন�ক�ল�য তা�র জীবন বিকাশের পথ খ�লে দেয়।

বিজ�ঞানের শিক�ষক হিসেবে মোতাহার হোসেনের নিজস�ব �কটা পাঠদান-পদ�ধতি ছিল। তিনি জটিল বিষয়কে সহজ করে মাতৃভাষায় বো�ানোর পক�ষপাতী ছিলেন। আর পাঠন-বিষয়ে উদাহরণ কিংবা সাদৃশ�য-বিবরণ আহরণ করতেন শিক�ষার�থীদের অভিজ�ঞতার জগৎ থেকে। ফলে তিনি সহজেই হয়ে উঠেছিলেন ছাত�রপ�রিয় শিক�ষক। তা�র পড়ানোর সহজ পদ�ধতির দর�নই নবপ�রবর�তিত পরিসংখ�যানবিদ�যার শিক�ষার�থীরা পরীক�ষায় ভালো ফল করতে পারত। কলকাতা বিশ�ববিদ�যালয়ের পরীক�ষকেরাও �সব ছাত�রের ‘গ�ছিয়ে জওয়াব’ লেখার প�রশংসা করতে ক�ন�ঠিত হননি।

তা�র পাঠন-প�রণালীর বৈশিষ�ট�য �বং শিক�ষার�থীর প�রতি গভীর মমতা ও মনোযোগের কারণে ছাত�রদের স�নৃতিতেও তিনি উজ�জ�বল হয়ে আছেন। কোনো যান�ত�রিক পদ�ধতি নয়, গতান�গতিক কোনো প�রণালীও নয়, তিনি পড়াতেন নিজস�ব �ক ভঙ�গিতে। তা�র শ�রেণীকক�ষে পড়ানোর ধরনটি ছিল � রকম: ‘...স�বকীয়তা ও অভিনবত�ব প�রকাশ পেত দৈনন�দিন ক�লাসর�মে তা�র পড়ানোর মা�েও। ...প�রচলিত ফর�ম�লার ধারেকাছে না গিয়ে তিনি নিত�যনত�ন ফর�ম�লা ও পদ�ধতি নিজেই উদ�ভাবন করতেন। ...তিনি চাইতেন ছাত�ররা যেন মূলস�ত�র (ফার�স�ট প�রিন�সিপাল) থেকে য�ক�তি প�রয়োগের দক�ষতা ও মানসিকতা অর�জন করতে পারে। বই থেকে না-ব��ে বা আধা ব��ে ক�লাসর�মে বা পরীক�ষার খাতায় উদ�গীর�ণ করা ছিল তা�র অতি অপছন�দ’ (কাজী ফজল�র রহমান, ‘কাজী মোতাহার হোসেন: �কজন সম�প�র�ণ মান�ষ’)।

পরিসংখ�যানবিদ�যা পঠন-পাঠনের ক�ষেত�রে মোতাহার হোসেন যেমন প�রবর�তকের দাবিদার, তেমনি বাংলায় বিজ�ঞানচর�চার ক�ষেত�রেও � দেশে তা�র ভ�মিকা পথিকৃতের। আমাদের বেশির ভাগ বিদ�বান-পন�ডিতের মধ�যে মাতৃভাষায় বিজ�ঞানচর�চা কিংবা পঠন-পাঠনের বিষয়ে �কটা অনীহা বরাবরই লক�ষ করা গেছে। � ক�ষেত�রে পরিভাষাসহ নানা অজ�হাত তা�রা খাড়া করে থাকেন। মোতাহার হোসেন �সব বক�তব�যকে ‘ছে�দো য�ক�তি’ বলে বিবেচনা করতেন।

মোতাহার হোসেন বরাবর বাংলা ভাষার মাধ�যমেই পড়িয়েছেন−প�রথমে পদার�থবিদ�যা, পরে পরিসংখ�যান। তবে পরিসংখ�যানের শিক�ষক হলেও মোতাহার হোসেনকে তা�র পূর�ব-বিষয় পদার�থবিদ�যার ক�লাসও কিছ� কিছ� নিতে হতো। পদার�থবিদ�যার �ক প�রাক�তন ছাত�র তা�র স�নৃতিচারণায় উল�লেখ করেছেন: ‘উচ�চ বিজ�ঞানের কথাও যে বাংলা ভাষায় সহজেই লেখা যায় �বং বলা যায়, �টা তা�র কাছ থেকেই প�রথম জানতে পারি’ (জামিল চৌধ�রী, ‘অ�যাবসেন�ট মাইন�ডেড প�রফেসর’)।

বাংলায় বিজ�ঞানচর�চা, পঠন-পাঠন, বই লেখা ও তর�জমার বড় সমস�যা ও অন�তরায় যে কেবল পরিভাষার নয়, মানসিকতারও−� বিষয়ে মোতাহার হোসেন শ�র� থেকেই সচেতন ছিলেন। দেশভাগের পর শিক�ষা বোর�ড গণিতের পরিভাষা সৃষ�টির যে উদ�যোগ গ�রহণ করে, তাতে মোতাহার হোসেনের সক�রিয় ভ�মিকা ছিল। পরিভাষার সমস�যা যে বিজ�ঞান পঠন-পাঠনের অন�তরায় হতে পারে না, সে বিষয়ে তিনি স�পষ�টই তা�র তথ�য-গণিত বইয়ের ভ�মিকায় বলেছেন। � সমস�যা মোচনের প�রয়োজনে তিনি নিজেও অনেক পরিভাষা উদ�ভাবন করেন �বং তা সত�যেন বস� ও আরও অনেকের অন�মোদনও পায়।

মোতাহার হোসেন নিজে বিজ�ঞান বিষয়ে বইপ�স�তক ও প�রবন�ধ-নিবন�ধ লিখে প�রমাণ করেন যে মাতৃভাষায় বিজ�ঞানের মতো গ�র�ভার বিদ�যার চর�চা সহজেই হতে পারে। তিনি তথ�য-গণিত (১৯৬৯), গণিতশাস�ত�রের ইতিহাস (১৯৭০) ও আলোক-বিজ�ঞান (প�রথম খন�ড, ১৯৭৫) রচনা করে যথাক�রমে পরিসংখ�যান, গণিত ও পদার�থবিদ�যা বাংলায় পড়ানোর পাঠ�যপ�স�তকের অভাব অনেকাংশে মিটিয়েছেন। �ই বই তিনটি তা�র মাতৃভাষায় বিজ�ঞান-চিন�তারই ফসল, সেই সঙ�গে প�রেরণাসঞ�চারী উজ�জ�বল দৃষ�টান�তও। �কসময় তিনি স�যার রোনাল�ড ফিশারের পরিসংখ�যান-সংক�রান�ত প�রামাণ�য গ�রন�থ স�টাটিসটিক�যাল মেথড-�র বাংলা অন�বাদেও হাত দিয়েছিলেন; নানা কারণে � কাজটি সম�পন�ন হতে পারেনি।

১৯৭৪ সালের ৯ ডিসেম�বর ঢাকা বিশ�ববিদ�যালয়ের �ক বিশেষ সমাবর�তন অন�ষ�ঠানে কাজী মোতাহার হোসেনকে সাম�মানিক ‘ডক�টর অব সায়েন�স’ উপাধি প�রদান করা হয়। �ই সমাবর�তন-সভায় তা�র পরিচিতি প�রসঙ�গে বলা হয়েছিল, ‘বাংলা ভাষায় বিজ�ঞানচর�চার যা�রা স�ত�রপাত করেছেন, আপনি তা�দের অন�যতম অগ�রণী।’ �ই স�বীকৃতি নিঃসন�দেহে তা�র প�রাপ�য।

যৌবনের প�রথমপর�ব থেকেই বাংলা ভাষায় বিজ�ঞানের নানা বিষয়ে প�রবন�ধ-নিবন�ধ �বং পরবর�তী সময়ে বই লিখে মাতৃভাষায় বিজ�ঞানচর�চার জোরালো দৃষ�টান�ত স�থাপন করেছেন মোতাহার হোসেন। � ধারায় তিনি জগদীশচন�দ�র বস�, রামেন�দ�রস�ন�দর ত�রিবেদী, জগদানন�দ রায় কিংবা সতেন�দ�রনাথ বস�র যোগ�য উত�তরস�রি।

কাজী মোতাহার হোসেন বিজ�ঞানসাধনার পাশাপাশি সাহিত�যচর�চাতেও ছিলেন নিবেদিত। তাই তা�র সাহিত�যবিষয়ক মননশীল রচনায় নিরাবেগ-য�ক�তিনিষ�ঠার বৈশিষ�ট�য �বং বিজ�ঞানবিষয়ক রচনায় সাহিত�যের সংবেদনা ও রসবোধ �বং সামাজিক কল�যাণচিন�তার ছাপও পড়েছে। তিনি নিজেও � কথা বলেছেন: ‘বিজ�ঞান যে সাহিত�য-রসে সঞ�জীবিত হয়ে প�রকাশিত হতে পারে �বং তা সমাজ ও জাতির মঙ�গলসাধনে শ�ভ ভ�মিকা গ�রহণ করতে পারে সেটা দেখানোও আমার উদ�দেশ�য’ (ভ�মিকা, নির�বাচিত প�রবন�ধ, প�রথম খন�ড)। তা�র ‘কবি ও বৈজ�ঞানিক’ প�রবন�ধে তিনি বিজ�ঞান ও সাহিত�যের সাদৃশ�য-বৈসাদৃশ�য নির�দেশের পাশাপাশি �দের পারস�পরিক সম�পর�ক-স�ত�র আবিষ�ককারের চেষ�টাও করেছেন। বিজ�ঞান ও সাহিত�যের মধ�যে �কটা সমন�বয়ের চিন�তা তা�র মনে যে সক�রিয় ছিল, তা বেশ বো�া যায়।

মোতাহার হোসেনের বিজ�ঞানচিন�তা ছিল নিখাদ ও য�ক�তিশাসিত। আমাদের দেশের অনেক মনীষীর মতো তিনি ধর�ম �বং বিজ�ঞানের অযৌক�তিক সমন�বয় ও সরল সমীকরণে বিশ�বাসী ছিলেন না। তাই তিনি স�পষ�টই বলতে পারেন: ‘বিজ�ঞান ও য�ক�তির সহিত সংঘর�ষে (অর�থাৎ জ�ঞানবিচার ও ব�দ�ধির ক�রমিক উন�নতির সঙ�গে সঙ�গে) ধর�মের আন�ষঙ�গিক বিশ�বাসগ�লোর যদি �কট� পরিবর�তন হয়, তবে তাহা দ�ষণীয় নহে বরং সেইটিই প�রয়োজন’ (সঞ�চরণ)। সক�রেটিস ও গ�যালিলিওর সত�য-প�রকাশের চরম পরিণাম-ফলের দৃষ�টান�ত টেনে � কথাও তিনি বলেছেন: ‘...মত বা মত প�রকাশের স�বাধীনতা না থাকলে পৃথিবীতে জ�ঞানের উন�নতি মারাত�মকভাবে ব�যাহত হত। বর�বরতা স�থায়ী করার শ�রেষ�ঠ উপায় হচ�ছে নত�নের সন�ধান ছেড়ে দিয়ে স�থায়ী হয়ে প�রাতনকেই আ�কড়ে বসে থাকা’ (কাজী মোতাহার হোসেন রচনাবলী, দ�বিতীয় খন�ড)। বিজ�ঞানচর�চায় তিনি ‘সংস�কারম�ক�ত নিরাসক�ত বিচার’কেই গ�র�ত�ব ও প�রাধান�য দিয়েছেন। তা�র বিবেচনায়, ‘...বৈজ�ঞানিক সচরাচর দৃশ�যমান জগতের প�রত�যেক বস�ত� ও ঘটনাকেই বিশেষভাবে পরখ করে দেখতে চান। তা�র কাছে ইন�দ�রিয়ের অগোচর বিষয়াদির প�রাধান�য নাই’ (সঞ�চরণ)।

বিশ�বাস নয়, নির�ভ�ল তথ�য আর অকাট�য য�ক�তিই বিজ�ঞানের প�রধান অবলম�বন−সিদ�ধান�তের মূল উপকরণ। তাই রক�ষণশীল শাস�ত�রবিশ�বাসী সাধারণের চোখে বিজ�ঞানীর স�বরৃপ ভিন�নভাবে উদঘাটিত। তাদের কাছে বিজ�ঞানীকে ‘বস�ত�তান�ত�রিক নির�মম বিশ�লেষক ও নাস�তিক’ আখ�যাও পেতে হয় অনেক সময়। কিন�ত� তা যে সঠিক মূল�যায়ন নয়, য�ক�তি দিয়ে তা তিনি প�রমাণ করেছেন।

কাজী মোতাহার হোসেনের বিজ�ঞানদৃষ�টির পেছনে নিছক জ�ঞানস�পৃহাই নয়, ছিল কল�যাণব�দ�ধি ও মানবতাবোধের ধারণাও। তিনি ১৯৩৯ সালে অধ�যাপক সত�যেন�দ�রনাথ বস�র �কটি ইংরেজি প�রবন�ধের অন�বাদ করেন ‘সভ�যতা ও বিজ�ঞান’ নামে। � প�রবন�ধটি তর�জমায় তিনি উদ�ব�দ�ধ হন শ�ভব�দ�ধির প�রেরণা আর নিজের মতের প�রতিফলন লক�ষ করে। প�রবন�ধটির মূল বিষয় ছিল বিজ�ঞানের আবিষ�ককারের অপপ�রয়োগ, �র নারকীয় ধ�বংসলীলা ও �র ফলে সভ�যতার সংকটের কথা �বং সর�বোপরি �ই সমস�যা-সংকট উত�তরণের উপায়-নির�দেশ।

মোতাহার হোসেন ছিলেন ব�দ�ধির ম�ক�তি-আন�দোলনের অন�যতম প�রোধা। ১৯২৬ সালে ঢাকায় প�রতিষ�ঠিত ম�ক�তব�দ�ধিচর�চার প�রতিষ�ঠান ‘ম�সলিম সাহিত�য-সমাজ’-�র বীজমন�ত�র ছিল−‘জ�ঞান যেখানে সীমাবদ�ধ, ব�দ�ধি যেখানে আড়ষ�ট, ম�ক�তি সেখানে অসম�ভব’। সংস�কারম�ক�ত, য�ক�তিবাদী, প�রগতিশীল, কল�যাণম�খী সমাজ গঠনই ছিল �র লক�ষ�য। ‘সাহিত�যসমাজ’-�র �ক বার�ষিক অধিবেশনের প�রতিবেদনে মোতাহার হোসেন উল�লেখ করেছিলেন: ‘আমরা চক�ষ� ব�জিয়া পরের কথা শ�নিতে চাই না, বা শ�নিয়াই মানিয়া লইতে চাই না...। ...আমরা চাই জ�ঞান-শিখা দ�বারা অসার সংস�কারকে ভস�নীভ�ত করিতে �বং সনাতন সত�যকে ক�হেলিকাম�ক�ত করিয়া ভাস�বর ও দীপ�তিমান করিতে’ (শিখা, দ�বিতীয় বর�ষ, ১৯২৮)। �ই সংগঠনের চিন�তা-চেতনার আলোকেই মূলত মোতাহার হোসেনের মন-মানস গড়ে উঠেছিল। ‘সাহিত�যসমাজ’-�র �ই য�ক�তির-প�রজ�ঞার-বিজ�ঞানমনস�কতার প�রেরণাতেই চিরকাল পথ চলেছেন মোতাহার হোসেন।

সত�যের অন�রোধে � কথা বলতেই হয় যে আমাদের দেশে বিজ�ঞানচর�চা যা�রা করে থাকেন, বিজ�ঞান পঠন-পাঠনের সঙ�গে যা�রা য�ক�ত, তা�দের অনেকেই প��থিশাসিত বিদ�বান। তা�রা সংস�কার, গো�ড়ামি, অন�ধবিশ�বাস, ভাবাল�তা, রক�ষণশীলতা, শাস�ত�রের দাসত�ব থেকে প�রোপ�রি ম�ক�ত নন। কিন�ত� মোতাহার হোসেন কখনো অন�ধবিশ�বাস বা প�রথার আন�গত�য করেননি, মানেননি সংস�কারের শাসন−ছিলেন য�ক�তি, প�রগতি ও শ�রেয়চেতনার পক�ষে−পরিপূর�ণ বিজ�ঞানমনস�কতায় সমর�পিত সৃজনশীল �ক বিজ�ঞানসাধক। কাজী মোতাহার হোসেনের সঙ�গে �খানেই অন�যদের মৌলিক ফারাক �বং �ই বিবেচনাতেই তিনি �কক ও অনন�য।