পিটিশন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং ছাত্রদের অবিলম্বে মুক্তি দিন

মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা,

আমরা আতঙ্কের সাথে লক্ষ্য করছি যে, অন্য কেউ  নয়, বরং আপনার তত্ত্বাবধায়ক সরকার - যাকে বাংলাদেশের মিডিয়ায় এবং পত্র-পত্রিকায় সাম্প্রতিককালে গঠিত হওয়া সরকারগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ‘ভদ্র ও সভ্য সরকার’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে, সেই সরকার ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচজন প্রবীণ অধ্যাপককে তথাকথিত 'সন্দেহের বশে' গ্রেফতার করেছে। সহ উপাচার্য, বিভাগীয় ডীন, বিভাগীয় প্রধানের মতো সম্মানজনক পদমর্যাদায় পূর্বে অধিষ্ঠিত ছিলেন এই শিক্ষকরা, তাদেরকে সাম্প্রতিক কালে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে ঘটে যাওয়া সরকার বিরোধী অশান্ত ঘটনার নেতৃত্ব দানের সন্দেহে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতারকৃত শিক্ষকরা হলেন,

  • অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন, চেয়ারম্যান, প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগ এবং আনবিক জীববিজ্ঞান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি ( DUTA ) এর সাধারণ সম্পাদক।

  • অধ্যাপক হারুন - উর - রাশিদ, ডিন, সমাজ বিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ।

  • অধ্যাপক সায়দুর রহমান, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন সহ উপাচার্য।

  • অধ্যাপক আবদুস সোবহান, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রগামী শিক্ষক সমিতির আহবায়ক।

  • অধ্যাপক মলয় কুমার ভৌমিক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যবস্থাপনা বিভাগ।

এর কিছুদিন পরে গ্রেফতার করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরো দু'জন শিক্ষককে -

  • অধ্যাপক সদরুল আমীন, প্রেসিডেন্ট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি এবং ইংরেজী বিভাগের অধ্যাপক।

  • অধ্যাপক নিমচন্দ্র ভৌমিক, অধ্যাপক ফলিত পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ।

এর মধ্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আটককৃত শিক্ষকেরা সম্প্রতি মুক্তি পেলেও, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত শিক্ষকেরা এখনো কারাগারে অন্তরীণ। সেই সাথে অন্তরীণ আছে ঢাকা বিসশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মনিরুজ্জামান। সম্মানীয় প্রধান উপদেষ্টা, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানী আগ্রাসনের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষককে রাতের আঁধারে গ্রেফতার করা হয়, এছাড়া এর আগে কিংবা পরে আর কখনই বাংলাদেশে নির্বাচিত সরকারের কার্যকলাপের সমালোচনার জন্য কিংবা সরকার বিরোধী কোন আন্দোলনে অংশ গ্রহণ করার জন্য কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে এভাবে গ্রেফতার করা হয়নি। মাননীয়, যেভাবে গভীর রাতে সাদা কাপড়ে নাসী বাহিনীর মতো এসে সুশৃংখল পুলিশ বাহিনী এই পাঁচজনকে তাদের বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গেছে, এবং তাদেরকে জ্ঞিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশের হাতে সোপর্দ করেছে, এদিক দিয়ে দেখতে গেলে আপনার প্রশাসন অবশ্যই বাংলাদেশে একটি নূতন ইতিহাসের সূচনা করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরকে এভাবে গ্রেফতার করে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বন্ধ করে দিয়ে আপনার সরকার শিক্ষা ব্যবস্থা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতাকে অসম্মান করেছে। একটি চলমান প্রশাসনের সমালোচনা কিংবা তাদের বিরুদ্ধে কোন অহিংস আন্দোলনকে গ্রেফতারের পরিবর্তে গঠনমূলক দৃষ্টিতে দেখা উচি। গ্রেফতারকৃত এই শিক্ষকরা যারা স্ব স্ব কর্মক্ষেত্রে একজন বিশেষজ্ঞ, তাদের সাথে আপনার প্রশাসন তৃতীয় শ্রেনীর অপরাধীদের মতো আচরণ করছে। এটি জাতির কাছে মোটেই বিশ্বাসযোগ্য নয় যে, তারা কোন ধরনের দেশদ্রোহীতামুলক কিংবা কোন অসামাজিক কাজের সাথে জড়িত ছিল। হয়তো তাঁরা আপনার প্রশাসনের গৃহীত অনেক নীতি বা কাজের সমালোচনা করে থাকতে পারনে, কিন্তু তাদেরকে কিছুতেই ২২শে আগষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে এবং তারপর সারা দেশে ঘটে যাওয়া জনতার সহিংস বিক্ষোভের নেপথ্যে কলকাঠি নাড়ার জন্য দায়ী করা যায় না। অপরদিকে, আরো লক্ষ্যনীয় ব্যাপার হলো, যেসব শিক্ষকরা সমাজে প্রগতিশীল চিন্তা, উদার গনতন্ত্রে বিশ্বাস, ধর্মীয় গোড়ামির উর্ধ্বে, সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের বিপক্ষের শক্তি হিসেবে পরিচিত তাদেরকেই আপনি তুলে নিয়ে গেছেন;  স্বৈরাচার এবং মৌলবাদের এর সর্মথক এবং পৃষ্ঠপোশষক যেসব মুখচেনা শিক্ষকরা রয়েছেন এবং যাদের অনেকেই এই সহিংস বিক্ষোভে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়েও ছিলেন, তারা এখনও ধরা - ছোঁয়ার বাইরে বহাল তবিয়তেই রয়ে গেছেন। এটা আপনার প্রশাসনের একটি সুপরিকল্পিত দুরাভিসন্ধিমূলক পদক্ষেপ নয় কি - মাননীয় উপদেষ্টা, আপনি এ অভিযোগের  কি জবাব দিবেন?

আমরা সবাই জানি, বর্তমান 'সেনা সমর্থিত তত্বাবধায়ক সরকার' পূর্বের বি.এন.পি ও জামাত সরকারের আমলা ও রাজনীতিবিদদের দ্বারা তৈরী করা দেশব্যাপী প্রচন্ড নৈরাজ্য, অশান্তি, অবাধ দুর্নীতির পরিস্থিতিতে ক্ষমতা গ্রহণ করেছেন। আমরা আশা করি, নানাবিধ বিশৃঙ্খলতা ও সমস্যার মধ্যেও তত্বাবধায়ক সরকারের মূল লক্ষ্য হবে - অবাধ ও সুষ্ঠ নির্বাচনের জন্য সবধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা ও নির্বাচনের জন্য সুস্থ পরিস্থিতি ও পরিবেশ নিশ্চিত করা। পূর্বের সরকারদের থেকে কাজকর্মে আপনারা আলাদা হবেন ভেবে, আমাদের অনেকেই প্রথমে আশার আলো দেখেছিলাম; ভেবেছিলাম যে, এই সরকার হয়তো আমাদেরকে দুর্নীতি বিরোধী, প্রগতিশীল, মুক্তচিন্তার গনতন্ত্র উপহার দিবে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে দেখছি তত্বাবধায়ক সরকার অকারণে অনেক অনাকাংক্ষিত রাজনৈতিক ব্যাপারে জড়িয়ে যাচ্ছেন, এবং অনেক ক্ষেত্রেই মূল লক্ষ্য থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন। যদিও সেনাপ্রধাণ বার বার বলে যাচ্ছেন যে সেনাবাহিনীর রাজনীতিতে আসার কোন ইচ্ছা নেই কিন্তু জেনারেল মইন নিজে প্রায়শঃই আবার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সুনিদির্ষ্ট রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। আমাদের মনে হয় জেনারেল মইন যেভাবে বর্তমান তত্বাবধায়ক সরকারকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাবিত করছেন তাতে আমাদের সেনাবাহিনীর কাছে ভুল সংকেত পৌছেছে আর তারা নিজেদেরকে এদেশের জনগণের ‘প্রভু’ মনে করছে। নতুবা কি করে তত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে একটার পর একটা মানুষের নূন্যতম মূল অধিকার লঙ্ঘনের দৃষ্টান্ত ঘটে চলেছে? সাম্প্রতিক কালে সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাহিনীর দ্বারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের উপর যে বর্বরোচিত হামলা চালানো হয়েছে, সেটা শুধু জনগণের প্রতি সামরিক ও পুলিশ বাহিনীর উগ্র ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণকেই ব্যক্ত করে। যদিও এটা সত্য যে, প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে আপনি দেশবাসীর কাছে এ ব্যাপারে দুঃখ প্রকাশ করেছেন এবং উত্তেজিত ছাত্র সমাজ ও জনগণকে শান্ত করতে কিছু পদক্ষেপও গ্রহন করেছেন, কিন্তু বিনা এজাহারে ও নীতি বহির্ভূতভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচজন সম্মানিত শিক্ষকের গ্রেফতারের ঘটনা আপনার সদিচ্ছা ও আন্তরিকতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তুলেছে।

 



 

স্বাধীন বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের গ্রেফতারের এই নৈরাজ্যজনক ঘটনার বর্ণনা আমাদেরকে আবার ১৯৭১ এর পাক হানাদার বাহিনী আর তার এদেশীয় দোসরদের গভীর ষড়যন্ত্রের নীল নকশার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, যখন আমাদের জাতীয় বীরদেরকে ধরে নিয়ে গিয়ে অত্যাচার করে, নির্যাতন করে, হত্যা করে পুরো জাতিকে পঙ্গু করে দেয়ার ষড়যন্ত্র করা হয়ে ছিল; এদের মধ্যে অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকও ছিলেন। আমরা এই ২০০৭ সালে বসে স্বাধীন বাংলাদেশে সেই একাত্তরের জঘন্য অপরাধের আর কোন পুনরাবৃত্তি দেখতে চাই না। এ দেশের জনগন পুলিশ কিংবা অন্য কোন আইন শৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীকে আর প্রভুর ভূমিকায় দেখতে চায় না। সে জন্য আমরা তত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড.ফখরুদ্দিনের কাছে নিম্নোলিখিত দাবী গুলো উত্থাপন করতে চাই :

১. এখনো আটককৃত বিশ্ববিদ্যালয়ের চারজন শিক্ষককে অবিলম্বে মুক্তি দেয়া হোক এবং দেশব্যাপী যে হাজার হাজার মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে যাদের বিরুদ্ধে কোন সুনিদির্ষ্ট অভিযোগ নেই তাদেরকে মুক্তি দেয়া হোক।


২. তদন্ত কমিশনের রিপোর্ট যেন সঠিকভাবে জনগনের সামনে আসে সেটা নিশ্চিত করতে হবে। শুধুমাত্র জনসাধারণকে শান্ত করার জন্য একটা তদন্ত কমিশন গঠন করাই যথেষ্ঠ নয়। হাবিবুর রহমানের তদন্ত কমিশনের রিপোর্ট কেন এবং কাদের ইঙ্গিতে আলোর মুখ দেখছে না, তা জনগন জানতে চায়।


৩. যেসব সেনা সদস্য আর পুলিশ সদস্য ছাত্রদেরকে দৈহিকভাবে আঘাত করেছে তাদেরকে যতো শীঘ্র সম্ভব আইনানুযায়ী বিচার করে সাজা দেয়া হোক।

৪. জরুরী অবস্থা সহ সংবাদ ও প্রচার মাধ্যম থেকে সব ধরনের নিয়ন্ত্রন ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হোক। দেশে কিংবা বিদেশে বসবাসকারী প্রত্যেকটি বাংলাদেশী নাগরিকের তার নিজের দেশে কি হচ্ছে সেটা জানার পূর্ণ অধিকার আছে। এটা তাদের সহজাত ও জন্মগত অধিকার, কোন সরকারের অনুগ্রহ নয়।

সর্বশেষ কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ :

৫. তত্বাবধায়ক সরকারের যে প্রধান দ্বায়িত্ব একটি অবাধ ও স্বচ্ছ নির্বাচন সেটিকে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে নিশ্চিত করুন আর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রয়োজনে নির্বাচনের সময় ও তত্বাবধায়ক সরকারের কাজের সময় সীমার সংবাদটি জনগণকে পৌছে দিন।
 

আমরা নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করি আপনাদের এখনও সময় আছে ভবিষ্যতের সরকারদের জন্য সঠিক উদাহরণ রেখে যাওয়ার। আমাদের বিনীত নিবেদন এই যে, তত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে আপনি উপরোক্ত পদক্ষেপগুলো নিলে, ভবিষ্যতের জন্য সেটা সুফল বয়ে আনতে সাহায্য করবে, অন্তত আমরা এটাই বিশ্বাস করি।

আপনার অনুগত,

মুক্তমনা মডারেশন টীম,

www.mukto-mona.com

২৮শে আগষ্ট, ২০০৭ (১৬ জানুয়ায়ী, ২০০৮ এ ঈষ পরিবর্তিত)

 

নোটঃ পিটিশনটির বক্তব্যের সাথে আপনি একমত পোষণ করলে অনুগ্রহ করে সাইন করুন এখান:

 



পিটিশনটি ইংরেজীতে পড়ুন

 

see our other petitions and statements