শেখ হাসিনা গ্রেপ্তার:আইনকে তার নিজস্ব পথে চলতে দিতে হবে
আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তারের ঘটনা সরকারের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ। দেশবাসী এখন হয়তো অধিকতর আগ্রহের সঙ্গে লক্ষ করবে, এই পদক্ষেপ সরকারের দুর্নীতিবিরোধী চলমান অভিযানকে জনগণের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু থেকে কোনোভাবে বিচ্যুত কিংবা সংস্কারের প্রশ্নকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে কি না।
শেখ হাসিনার মতো বড় মাপের নেত্রীকে যখন বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হচ্ছে, তখন রুই-কাতলা বিবেচনায় তো অন্য সন্দেহভাজনদের পার পাওয়ার কথা নয়। এখন সংগত কারণে প্রশ্ন উঠবে, তাঁকে গ্রেপ্তারের সঙ্গে বহুল আলোচিত মাইনাস টু ফর্মুলার যোগসুত্র কতটা। আওয়ামী লীগ, বিশেষ করে শেখ হাসিনাপন্থীরা এই গ্রেপ্তারের ঘটনাকে স্বাভাবিকভাবেই ষড়যন্ত্রমূলক হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন এবং বলা নিষ্কপ্রয়োজন যে, তাঁদের এ ধরনের প্রতিক্রিয়া রাজনৈতিক আবেগতাড়িত। দুই নেত্রীকে নির্বাসিত করার সরকারের উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার পটভুমিতে শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তারের ঘটনা প্রত্যাশিত সংস্কার ও দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের পরিবেশে একটা বাস্তব চাপ ও ঝুঁকি তৈরি করবে।
আমরা সর্বাগ্রে আশা করব, শেখ হাসিনার সম্ভাব্য বিচারপ্রক্রিয়ায় প্রচলিত আইনের সব শর্ত স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে পূরণ করা হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো ভুল পদক্ষেপ দেশ-বিদেশে নেতিবাচক সংকেত পাঠাতে পারে, যা কখনোই দেশের জন্য কল্যাণকর হবে না। তাই এমন কিছু কাম্য নয়, যা কোনো অনভিপ্রেত পরিস্থিতি সৃষ্টি বা সদ্য ঘোষিত নির্বাচনী রোডম্যাপ বাস্তবায়নের প্রয়াসকে ম্লান করার হুমকি তৈরি করে।
আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক ভিত্তি দেশব্যাপী বিস্তৃত। তবে শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তারের বিপর্যয়কর ঘটনা মোকাবিলায় দলটির নীতিনির্ধারকদের বিচক্ষণতা ও দুরদর্শিতার বিকল্প নেই। আইনগতভাবেই এর মোকাবিলা বাঞ্ছনীয়। প্রতিবাদের ভাষা হতে হবে যৌক্তিক ও শান্তিপূর্ণ। যত বড় নেতা গ্রেপ্তার, তত বড় ভাঙচুরের সংস্কৃতিকে অবশ্যই পেছনে ফেলতে হবে।সরকারকেও হতে হবে দায়িত্বশীল। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ বিশ্বাসযোগ্য না হলে জনগণ কিন্তু সন্দেহ করবে। পরিহাস হচ্ছে, অনেকের মতে, অর্থবহ সংস্কারে বিমুখ দুই নেত্রীর যে কাউকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে গিয়ে সরকারকে দুধারি তলোয়ারের মুখে পড়তেই হবে। তবে এ ক্ষেত্রে এর বিশ্বাসযোগ্য রক্ষাকবচ হচ্ছে, আইন সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করা। অনেকেই এখন বলতে পারেন, গত পাঁচ বছর লুটপাটের রাজত্ব করলেন খালেদা জিয়া, আর গ্রেপ্তার হলেন শেখ হাসিনা। এর জবাবও সরকারকে যৌক্তিকভাবে দিতে হবে।
বাংলাদেশের শাসকগোষ্ঠী অতীতে সব সময় ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় নিজেদের লোকদের বিচার করতে ব্যর্থ হয়েছে। মূলত এ কারণেই দুই জনপ্রিয় নেত্রীর ভাবমূর্তি আজ এমন কালিমালিপ্ত হয়েছে। ১১ জানুয়ারির সর্বসম্মত পরিবর্তন-পরবর্তী বাংলাদেশে সেই ক্লেদাক্ত ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে তা হিতে বিপরীত হতে বাধ্য।
সংস্কারপন্থী হিসেবে পরিচিত মুখগুলোর দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। নইলে এমন এক দুর্ভাগ্যজনক বিভাজনরেখা তৈরি হতে পারে, যা চুড়ান্ত বিচারে সংস্কারের মূল চেতনাকেই দুর্বল করবে।
অভিযোগের আঙ্গুল যাঁদের দিকে ইতিমধ্যে উঠেছে বা আগামী দিনে উঠতে পারে, তাঁদের ব্যাপারে আইনকে তার আপন গতিতে চলতে দিতে হবে। আবার বলব, আইনের নিজস্ব গতিকে রুদ্ধ করার যে প্রবণতা এ দেশের মানুষ প্রত্যাখ্যান করেছে, এর পুনরাবৃত্তি আমরা কেউ চাই না।
প্রথম আলো সম্পাদকীয়
জুলাই ১৭, ২০০৭